মাতৃগর্ভেই শিশুর জেনেটিক রোগ নির্ণয় হচ্ছে দেশে

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:৫০

মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় শিশুদের জেনেটিক রোগ নির্ণয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালে চালু হয়েছে অত্যাধুনিক ডিএনএ ল্যাব। এরফলে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই প্রাণঘাতী ও জটিল রোগের বিরুদ্ধে চিকিত্সা দেয়া সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে অনেক শিশু এর সুফল পেয়েছে।

বাংলাদেশ হিউম্যান জেনেটিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ও জাইকার আর্থিক সহযোগিতায় ঢাকা শিশু হাসপাতালের নতুন ভবনের দোতলায় ২০১৩ সালের মে মাসে এই ডিএনএ ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৬ সাল থেকে ফাউন্ডেশন জেনেটিক রোগ সম্পর্কে গণসচেতনতা ও প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরিতে কার্যক্রম চালাচ্ছিল। পরবর্তীতে ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন জেনেটিক বিভাগ চালু, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি ও হাসপাতালের অর্গানোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করার অনুমোদন দেন। পরে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ড জেনেটিক বিভাগ চালুর বিষয়টি অনুমোদন দেয়।
ডিএনএ ল্যাবে শিশু জন্মের পূর্বে কোরিওনিক ভিলাই বা মাতৃজঠরের পানির নমুনা সংগ্রহ করে  প্রি-নেটাল ডায়াগনোসিস করার মাধ্যমে মরণ ও জটিল ব্যাধি শনাক্ত করা হয়। এ রোগসমূহ হচ্ছে, থ্যালাসিমিয়া, ডাউন সিন্ড্রোম, ডুসেন মাসকুলার ডিসট্রফি, জন্মগত হূদরোগ ও ব্লাড ক্যান্সার। এসব রোগের চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাধারণ ও মধ্যবিত্ত লোকের পক্ষে এসব রোগের চিকিত্সা করা কঠিন।
ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের তথ্যানুযায়ী প্রতি বছর ১০ সহস্রাধিক শিশু থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে। এদের রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। থ্যালাসিমিয়া পিতামাতা উভয়ের থাকলে তাদের সন্তান এ রোগে আক্রান্ত হবে। থ্যালাসিমিয়া শিশু নিয়ে পিতামাতার যে কি দুর্ভোগ তা চোখে না দেখলে বোঝা যায় না।  ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অস্থির ভাব দেখা যায়। এরা হাবাগোবা ও বিকলাঙ্গ হতে পারে। টার্নার সিন্ড্রোম আক্রান্তদের কিডনি, হূদরোগ, চোখ ও কানে জটিলতা থাকে। ডুসেন মাসকুলার ডিসট্রফিতে আক্রান্ত   শিশুদের পেশী দুর্বল হয়ে ঝুলতে থাকে। হাড়গুলো চিকন হয়ে যায়। ১৫/ ১৬ বছর বয়সে গিয়ে তারা মারা যায়। জন্মগত হূদরোগের মধ্যে হূদযন্ত্র ছিদ্রসহ বিভিন্ন ধরনের জটিলতা থাকে। গর্ভাবস্থায় পরীক্ষা করে শিশুদের ব্লাড ক্যান্সারও নির্ণয় করা সম্ভব।
চিকিত্সকরা বলেন, থ্যালাসিমিয়া, ব্লাড ক্যান্সারসহ জেনেটিক রোগসমূহ গর্ভাবস্থায় ধরা পড়লে গর্ভপাত ঘটিয়ে পুনরায় সন্তান নিতে পারে পিতামাতারা। অনেক পিতামাতা রোগের ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী চিকিত্সাসেবা দিয়ে ঐসব শিশুকে সুস্থ করার ব্যবস্থা নেন। পাকিস্তান, ইরান, ইরাকসহ বহু দেশে জেনেটিক রোগ আক্রান্ত শিশু চিহ্নিত হলে গর্ভপাত ঘটানো হয়। ঐ সব দেশে বহু আগে থেকে এ পদ্ধতি চালু। এ দেশে জেনেটিক রোগ অসংখ্য। যার সঠিক কোন তথ্য নেই বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১০ ভাগ থ্যালাসিমিয়ার বাহক। উপজাতীয়দের মধ্যে ৪০ ভাগ থ্যালাসিমিয়া বাহক রয়েছে। অধ্যাপক ডা. ওয়াকার আহমেদ খান, অধ্যাপক ডা. বিলকিস বানু, সহযোগী অধ্যাপক ডা. বেলায়েত হোসেন ও সিনিয়র বায়ো কেমিস্ট্রি গোলাম সরওয়ারের নেতৃত্বে ডিএনএ ল্যাব পরিচালিত হচ্ছে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন বলেন, ডিএনএ ল্যাব প্রতিষ্ঠা হওয়ায় মাতৃগর্ভে থাকা শিশুদের নানা রোগ দ্রুত শনাক্ত করে চিকিত্সা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। এ সম্পর্কে সারাদেশে সচেতনতা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। জেনেটিক বিভাগকে দ্রুত সম্প্রসারণ করা হবে। ডিএনএ ল্যাবের সঙ্গে যুক্ত হবে নবজাতক স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম। এর ফলে নবজাতকের হাইপ্রোথাইরয়েডিজমসহ বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয় করে প্রতিকার করা সম্ভব বলে তিনি জানান।