বিমান বন্দরের নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৪:০৮

রবিবার দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের এয়ার ক্রাফট ছিনতাই চেষ্টার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে কিভাবে একজন অস্ত্রধারী বিমানে প্রবেশ করলো, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। বিমানবন্দর এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা দুর্বলতার বিষয়টি সামনে চলে আসায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেবে। এর আগেও নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ থেকে কার্গো বিমান চলাচল সাময়িক বন্ধ রেখেছিল।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যাত্রীরা নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করেই এয়ারক্রাফটে উঠে। তাতে কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বিমানে প্রবেশের সুযোগ না থাকার কথা। বিমান ছিনতাই চেষ্টাকারীর হাতে পিস্তল রয়েছে বলে জানান হয়। যদিও এটি নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশি একটি বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনা এই প্রথম ঘটল। যা বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি নষ্ট করতে যথেষ্ট। প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে অস্ত্র নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে কেউ উড্ডয়নের সুযোগ পেল? এটি স্পষ্টত, নিরাপত্তাদুর্বলতার কারণে হয়েছে।

বাংলাদেশে এর আগেও নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে নানা কথা ছিল। এধরনের সমালোচনা নতুন কিছু নয়। বিমান চলাচল ও পর্যটক বিষয়ক বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ বিমানের সাবেক পরিচালক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এত নজরদারির পরও কিভাবে এমনটি ঘটলো? এটিই প্রমাণ করে যে নিরাপত্তায় ঘাটতি ছিল। তারমতে, কোনো না কোনো ভাবে নিরাপত্তার ঘাটতি হয়েছে। এটি মেশিনে হোক কিংবা এর পেছনে অন্য কেউ থাকুক।

নিরাপত্তা ইস্যুটি যদি সামনে চলে আসে তবে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের ইমেজের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা হবে। এই ধারণা কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী বললেন বিমানটি জরুরী অবতরণ করেনি

বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেছেন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ছিনতাইয়ের কবলে পড়া বিমানটি জরুরী অবতরণ করেনি। স্বাভাবিক ভাবেই এটি শাহআমানতে অবতরণ করার কথা ছিল। সেটিই হয়েছে। সোমবার ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এখানে এমন কোনো লিকেজ ছিল না যে কেউ একজন যাত্রী এভাবে বিমানে যেতে পারেন। তাহলে পিস্তল নিয়ে কিভাবে গেল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তের পর জানা যাবে। তবে বিমান বন্দরে নিরাপত্তার ত্রুটি পাওয়া যায়নি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, কলিগদের কাছে জানতে পারি বিমান হাইজ্যাক হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদারের কথা বললাম। প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হলে জানলাম তিনি ঘটনাটি জানেন। কমান্ডো প্রসিড করতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সার্বক্ষণিক পুরো বিষয়টি মনিটর করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক, সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এম নাঈম হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। মহিবুল হক বলেন, সিসিটিভিতে আমরা দেখেছি অন্য দশজন যাত্রীর মত তাকেও তল্লাশি করা হয়েছিল। তার কাঁধে একটি ব্যাগ ছিল। সে স্ক্যানিং মেশিনের ভেতর দিয়ে গেছে। সেখানে কিছু দেখা যায়নি। অস্ত্র প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, সেটি অস্ত্র কি না আমরা ওয়াকিবহাল না। এটা তদন্ত প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত বলতে পারবো।

উপস্থিত সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এম নাঈম হাসান বলেন, এয়ারক্রাফটে গুলি বিনিময় হলে তার চিহ্ন থাকতো। আমরা কোনো চিহ্ন পাইনি। যাত্রীরা গুলির শব্দ শোনার কথা বলেছেন। খেলনা পিস্তলেও শব্দ হয়। সেটি তদন্ত না করে আসল নাকি নকল তা বলা যাবে না। তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তার আধুনিকায়ন এবং এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন। তারমতে, সুষ্ঠু তদন্ত করে সেই মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরাপত্তা জোরদারকরণ এই মুহূর্তে জরুরি।

বিশ্লেষকদের কারো কারো মতে, বাড়তি নিরাপত্তা দেখাতে গিয়ে বিদেশি পর্যটক কিংবা যাত্রী হয়রানি যাতে না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। উন্নত দেশের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রী হয়রানি নেই, কিন্তু উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিদ্যমান। সে বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

দুটি তদন্ত কমিটি গঠন

বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জনেন্দ্র নাথ সরকারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই কমিটি আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৪ বনদস্যু নিহত

অপরদিকে, বাংলাদেশ বিমান চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বাংলাদেশ বিমানের পরিচালক (পরিকল্পনা) মাহবুব জাহান খানকে প্রধান করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিমানের একটি সূত্র।

দুবাই গেলেন সেই ফ্লাইটের যাত্রীরা

সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ বিমানের বিজি ১৪৭ ফ্লাইটটির (ছিনতাই চেষ্টার কবলে পড়া) যাত্রীরা দুবাই’র উদ্দেশে রওনা দেয়। দুপুর সোয়া একটায় বোয়িং ৭৭৭ এয়ারক্রাফট যাত্রীদের নিয়ে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাইর উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। ফ্লাইটটি নিরাপদে দুবাই পৌঁছে বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য যে, বিজি ১৪৭ ফ্লাইটটি রবিবার ঢাকা থেকে ছেড়ে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফ্লাইটটির যাত্রীদের রবিবার রাতে চট্টগ্রামের একটি হোটেলে রাখা হয়।

ইত্তেফাক/আরকেজি