কেন্দুয়ায় প্রাচীন বাংলার পুরাকীর্তি ধ্বংসের পথে

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪, ১০:১৯

অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের পথে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় ঐতিহাসিক রোয়াইলবাড়ী পুরাকীর্তি। প্রাচীন বাংলার শাসনকর্তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যমণ্ডিত রোয়াইলবাড়ীতে একসময় ইতিহাসের কতো ঘটনাই না ঘটেছে। সে ইতিহাস আজ পুরোপুরি জানা না গেলেও শাসনকর্তাদের শৌর্য্য-বীর্যের সাক্ষী হয়ে আজ ধ্বংসস্তূপাকারে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে এ পুরাকীর্তি।
কেন্দুয়া উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে রোয়াইলবাড়ী পুরাকীর্তির অবস্থান। এর পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বেতাই নদী। বর্তমানে পাশেই গড়ে ওঠেছে রোয়াইলবাড়ী বাজার।
ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্ ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে কামরূপের রাজা নীলাম্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কামরূপ জয় করেন। পরে তার পুত্র নসরত্ শাহ্ কামরূপ শাসনের এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণে রোয়াইলবাড়ীতে আশ্রয়গ্রহণ করেন। তিনি এর নামকরণ করেন ‘নছরত্ ওজিয়াল’ বা ‘নছরত্ আজিয়াল’। পরবর্তীতে তার এই প্রদেশটি নছরত্শাহী পরগনা নামে পরিচিত হয় এবং ভারত সম্রাট আকবরের সময় পর্যন্ত পরগনাটি এ নামেই পরিচিত ছিল। মসনদে আলী ঈশা খাঁ এ অঞ্চলে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ী ও কেন্দুয়ার রোয়াইলবাড়ী দুর্গের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন। ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর দেওয়ান জালাল এখানকার আধিপত্য গ্রহণ করেন। তিনি রোয়াইলবাড়ী দুর্গের ব্যাপক সংস্কার এবং দুর্গের বহিরাঙ্গনে একটি সুরম্য মসজিদ নির্মাণ করেন। এটি ‘মসজিদ-এ জালাল’  বা ‘জালাল মসজিদ’ নামে পরিচিত ছিল।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রোয়াইলবাড়ী দুর্গে খননকাজ পরিচালনা করে। মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন নিদর্শন। ইটের দেয়ালবেষ্টিত দুর্গ, মূল প্রবেশদ্বার (সিংহদ্বার), বহু কক্ষবিশিষ্ট একাধিক ইমারতের চিহ্ন, শান বাঁধানো ঘাটসহ দুটি বড় পুকুর, দুটি পরিখা, বুরুজঢিবি বা উঁচু ইমারত (টাওয়ার), বারোদুয়ারী ঢিবি, কবরস্থান, মসজিদ, মিহরাব, চওড়া প্রাচীর, লতাপাতা ও ফুল-ফলে আঁকা রঙিন প্রলেপযুক্ত কারুকাজ, পোড়ামাটির অলংকৃত ইট, টালি, জ্যামিতিক মোটিভ, টেরাকোটা, বর্শা, প্রস্থরখণ্ড এবং লোহা ও চিনামাটির তৈরি নানা ধরনের জিনিসপত্র।
প্রায় ৪৬ একর জায়গা নিয়ে রোয়াইলবাড়ী পুরাকীর্তি এলাকা। দুর্গ এলাকাটির তিনটি ভাগে বিভক্ত। মূল দুর্গের পূর্বদিকের ইটের দেয়ালে রয়েছে সিংহদ্বার। পুকুর দুটি রয়েছে দুর্গের সামনের অংশের পূর্বদিকে। সিংহ দরজা বরাবর একটি উঁচু রাস্তা দ্বারা পুকুর দুটি বিভক্ত করা ছিল। দক্ষিণ দিকের মাটির দেয়ালের দু’পাশে ছিল দুটি পরিখা। অভ্যন্তরীণ পরিখাটি একটি নালার মাধ্যমে পুকুর দু’টির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। দক্ষিণ দিকের পরিখাটি বেতাই নদী থেকে আসা নৌযানসমূহ নোঙ্গর করার জন্য ব্যবহূত হতো বলে অনুমান করা হয়।
ধারণা করা হয়, দুর্গের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বড় বড় পাথরখণ্ড দিয়ে নির্মিত আরও দুটি প্রবেশপথ ছিল। দুর্গের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষিত এলাকার উত্তরাংশে রয়েছে একটি বুরুজ ঢিবি (উঁচু ইমরাত বা টাওয়ার), একটি প্রবেশপথ ও কবরস্থান। বুরুজ ঢিবিটির পরিমাপ ২৫ মিটার বাই ২১ দশমিক ৭ মিটার। বুরুজ ঢিবির পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ, সমান্তরাল তিনটি দেয়াল, প্রবেশদ্বার, ওয়াচ টাওয়ার ও চওড়া সিঁড়ি। খননের সময় পর্যন্ত দুর্গের অভ্যন্তরে উত্তর ও পূর্বদিকের প্রবেশ দেয়াল দুটি সাদা, নীল, সবুজ ও বাদামি রংয়ের চকচকে টালি দিয়ে বিভিন্ন ফুল-ফল, লতাপাতা এবং দড়ির নক্শায় সজ্জিত ছিল। এখন এগুলো শেওলা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। বারোদুয়ারী ঢিবিটির অবস্থান সিংহ দরজার দক্ষিণ প্রান্তে। এলাকায় এটি ‘বারো দরজার ইমারত’ নামে পরিচিত। খননের পর এখানে কারুকার্যমণ্ডিত যে মসিজেদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়; ধারণা করা হয়, এটিই দেওয়ান জালাল নির্মিত ‘মসজিদ-এ জালাল’ বা ‘জালাল মসজিদ’।
জানা যায়, এ মসজিদের ১৫টি গম্বুজ ছিল। এছাড়া মসজিদের কাঠামোতে ছিল ১২টি দরজা, পাঁচটি খুতবা পাঠের মেহরাব (মিম্বর) এবং মার্বেল পাথরের তৈরি বিশাল কয়েকটি খিলান। মসজিদের দেয়ালগুলো প্রায় সাত মিটার চওড়া। এতে ঝিনুক, চুন ও সুড়কির প্রলেপ দিয়ে ইট ব্যবহার করা হয়। চমত্কার সূর্যমুখী ফুলের নক্শায় পরিপূর্ণ ছিল এর দেয়ালগুলো। দুর্গের দক্ষিণ দিকের খোলা ময়দানটিকে সৈন্যবাহিনীর প্যারেড গ্রাউন্ড হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া দুর্গের বিভিন্ন অংশে আরো বেশ কয়েকটি ভবন বা ইমারতের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। কথিত আছে, দুর্গের অভ্যন্তরের একটি কবরেই শুয়ে আছেন নেয়ামত বিবি। প্রত্নতত্ত্ব গবেষকদের মতে, রোয়াইলবাড়ীর দুর্গের সমস্ত স্থাপনা সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত হলেও এর কারুকাজ ছিল অনেক বেশি নান্দনিক ও শিল্পসমৃদ্ধ।
কালের আবর্তে রোয়াইলবাড়ী নামের ঐতিহাসিক স্থানটি আজ শুধুই এক ধ্বংস্তূপ, ভূতুড়ে এলাকা। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কেবল খনন করেই দায় সেরেছে। উদ্ধার করা ধ্বংসাবশেষগুলো রক্ষণাবেক্ষণের কোন উদ্যোগই নেই। এর পাশের একটি স্থানে এলাকাবাসীর উদ্যোগে মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়েছে। দুর্গ এলাকার বেতাই নদীর পাড়ে গড়ে ওঠেছে রোয়াইলবাড়ী বাজার। ঐতিহাসিক স্থানটির প্রাচীন নিদর্শনগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু লোক এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু ঝোপঝাড়, আগাছা আর শেওলায় আবৃত দুর্গের এমন অবস্থা দেখে সকলেই মর্মাহত হন। এছাড়া এখানে আগতদের জন্য বসার, বিশ্রাম নেয়ার বা থাকার মতো তেমন কোন ব্যবস্থাও নেই। সরকার উদ্যোগ নিলেই এটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটে পরিণত হতে পারে।