পাকিস্তানে স্কুলে জঙ্গি হামলায় ১৩২ শিশুসহ নিহত ১৪১

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪, ০৯:১১
পাকিস্তানের পোশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে গতকাল মঙ্গলবার তালেবান হামলায় ১৩২ শিশু শিক্ষার্থীসহ ১৪১ জন নিহত হয়েছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। আহত হয়েছে ১২৪ জন। নিহত শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগের বয়স ১ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে চালানো সামরিক অভিযানে ছয় জঙ্গির সবাই নিহত হয়েছে। গতকালই অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তান তেহরিক ই-তালেবান (টিটিপি) এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। নৃশংস ঘটনায় দেশটিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। তালেবানের বর্বরোচিত এই হামলায় জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পাকিস্তানের কিশোরী মালালা ইউসুফজাই ও ভারতের কৈলাস সত্যার্থীসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। খবর বিবিসি, ডন, রয়টার্স ও এএফপি’র।
পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে পাঁচ থেকে ছয়জন বন্দুকধারী স্কুলের দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। নিরাপত্তা বাহিনীর ছদ্মবেশে তারা ভেতরে যায়। স্কুলটিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় পাঁচশো। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, স্কুলের ভেতর থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সাড়ে নয়শ’র বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। পুরো স্কুলটি ঘিরে অভিযান চালায় সামরিক বাহিনী। জঙ্গিরা যখন স্কুলটিতে আক্রমণ করে, তখন সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল স্কুল ছাত্রদের প্রাথমিক চিকিত্সার প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল।
পাকিস্তানের জিও টেলিভিশনকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে স্কুলের কর্মচারী মুদাচ্ছির আওয়ান জানিয়েছেন, ছয় থেকে সাতজন বন্দুকধারীকে তিনি হামলা চালাতে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘গোলাগুলি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ক্লাশ রুমের দিকে ছুটে যাই। জঙ্গিরা প্রত্যেক ক্লাশরুমে ঢুকে শিক্ষার্থীদের হত্যা করছিল।’ আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, তারা স্কুলটির ভেতর থেকে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের চিত্কার শুনেছেন।
আতঙ্কে অভিভাবকরা
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা প্রিয় সন্তানের জন্য স্কুলের চারপাশে দিনভর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। অভিভাবকরা বেশিরভাগই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অনেককে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক মা তার সন্তান হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন। কোনো কোনো অভিভাবক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, স্কুলে সন্তান পাঠিয়ে আর নিশ্চিন্তে বসে থাকা যাবে না ঘটনার পর আশেপাশের এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। শহরের প্রধান প্রধান রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয় । স্কুল এলাকায় একটি হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখা হয়। স্কুলটি পেশোয়ারের সেনা ক্যান্টমেন্টের খুব কাছের ওয়ারস্যাক রোডে অবস্থিত। স্কুল শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সন্তান। পেশোয়ারের প্রাদেশিক তথ্যমন্ত্রী মুস্তাক ঘানি বলেন, বেশিরভাগই আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয়েছে। নিহতদের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালের বারান্দায় কেবল সাদা কাপড়ে মোড়া সারি সারি লাশ। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত উদ্ধার অভিযান সংগঠনের প্রধান বিলাল আহমেদ ফাইজি বলেন, ওই এলাকায় যেন অন্ধকার নেমে এসেছে। তিনি জানান, অভিযান শেষ হয়েছে।
আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা
স্কুল প্রাঙ্গনে ১৫টি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। হামলায় যেসব শিশু নিহত হয়েছে তারা আর কোনদিন ফিরে আসবে না কিন্তু যারা বেঁচে গেছে তারা শরীরে বুলেট নিয়ে হাসপাতালে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। রক্তাক্ত বিছানায় শুয়ে কেউ কেউ নৃশংস ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছে। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর দাবি, তারা সহপাঠীদের হত্যা করা কালো বুট পরা বন্দুকধারীদের বর্বরতা ভুলতে পারবে না। কেউ আবার এখনো আতঙ্কে আছে। তাদের কানে ভেসে আসছে বুট এবং বন্দুকের গুলির শব্দ।  উদ্ধার হওয়া এক শিক্ষার্থী জানায়, গোলাগুলি বন্ধ হয়ে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের উদ্ধার করতে আসেন। আমরা শ্রেণীকক্ষ থেকে বের হয়ে দেখি বারান্দায় আমাদের অনেক বন্ধুর মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। কাউকে কাউকে তিন থেকে চারটি করে গুলি করা হয়েছে। অপর এক শিক্ষার্থী বলে, মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি। শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা বন্দুকধারীদের কয়েকজনকে বিদেশি ভাষায় কথা বলতে শুনেছে এবং সেটা সম্ভবত আরবি। গত বছর সেপ্টেম্বরে এই পেশোয়ারে জঙ্গি হামলায় অনেক শিশু নিহত হয়।
দায় স্বীকার টিটিপির
টিটিপি’র মুখপাত্র মুহাম্মদ খোরাসানি এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে বলেছেন, সেনাবাহিনীর অভিযানের পাল্টা জবাব দিতেই এই হামলা। তিনি গতকাল জানান, স্কুলে হামলাকারীদের মধ্যে ছয়জন প্রশিক্ষিত জঙ্গি রয়েছে। এদের সবাই আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী। জঙ্গিদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যেন অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সী ছাত্রদের হত্যা করে। স্কুল অডিটোরিয়ামের ভেতরে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণের কারণেই বেশিরভাগ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সেনাবাহিনীর সদস্য রয়েছেন। উল্লেখ্য, দেশটির খাইবার পাখতুনখাওয়ার কাছে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সামপ্রতিক সেনা অভিযানে বহু জঙ্গি নিহত হয়।
স্কুলে তালেবান হামলার খবর শুনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ পোশোয়ারে ছুটে যান এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান তত্ত্বাবধান করেন। আইএসপিআর মহাপরিচালক জেনারেল আসিম বেজওয়া টুইটারে বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনী স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (এসএসজি) স্কুলটির চারজন নারী শিক্ষক এবং সাতজন পুরুষ স্টাফকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করেছে। আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ষষ্ঠ জঙ্গিকেও হত্যা করে সেনাবাহিনী। জঙ্গিদের দখলে থাকা চারটি ব্লকের সবকয়টি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা
বর্বর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নওয়াজ শরীফ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। পেশোয়ারের প্রদেশিক রাজধানীতে পৌঁছে হামলার ঘটনা সম্পর্কে গণমাধ্যমে ব্রিফ করার সময় তিনি এ ঘোষণা দেন। এদিকে স্কুলে তালেবান হামলার নিন্দায় পাঞ্জাব গণপরিষদে সর্বসম্মতভাবে শোকপ্রস্তাব পাশ হয়েছে। আইন প্রণেতারা শোক প্রস্তাবে সেনাবাহিনীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তালেবান জঙ্গির বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জারব-ই-আজব অভিযানে আইন প্রণেতারা তাদের সমর্থন প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের বিরোধী দলীয় নেতা এবং সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান এই হামলাকে বর্বর হিসাবে নিন্দা জানিয়েছেন। হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নওয়াজ শরীফ আজ বুধবার পেশোয়ারের গভর্ণর হাউসে সকাল সাড়ে ১১টায় সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছেন। সব দলের নেতাদের বৈঠকে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানাতে তথ্যমন্ত্রী পারভেজ রাশিদ এবং অর্থমন্ত্রী ইশাক দারকে দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নিন্দা
জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন গতকাল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে তালেবানের এই ধরনের ন্যাক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, পেশোয়ারে স্কুলে যেটি করা হয়েছে সেটা অত্যন্ত ভীতিকর। তিনি বলেন, নিষ্পাপ শিশুদের উপর এই কাপুরুষোচিত হামলা মেনে নেয়া যায় না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই জঘন্য হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তানের জনগণের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, শিশুদের উপর হামলা চালিয়ে তালেবান আবারো তাদের নৃশংসতার পরিচয় দিল। পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এটাকে জঘন্যতম হামলা আখ্যায়িত করে নিন্দা জানান। ইসলামাবাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তানের স্কুলের ওইসব নীরিহ শিশু এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ওপর এ ধরনের হামলা কান্ডজ্ঞানহীন।
ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি স্কুলে হামলার তীব্র নিন্দা জানান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এটা কান্ডজ্ঞানহীন বর্বর হামলা। এটা এমনই একটি নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তিনি সন্তান হারানো বাবা-মায়ের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
মালালা ও কৈলাসের নিন্দা

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মালালা বলেন, আমি মর্মাহত এবং এই ঘটনায় আমার হূদয় ভেঙ্গে গেছে। ঠান্ডা মাথায় ঘটানো নৃশংস এই হামলার চরম নিন্দা জানাই আমি। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ভারতের কৈলাস সত্যার্থী বলেন, আমার জানামতে আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের ঘটনা এটি। তালেবানদের প্রতি বলেন, ‘তোমরা প্রয়োজনে আমাকে মেরো ফেলো, বিনিময়ে ওইসব নিষ্পাপ শিশুদের ছেড়ে দাও।’