সালাম লিখেছে- মা, রফিক লিখেছে মা, বরকত লিখেছে মা- আমরা পারিনি তাই, তাদের ত্যাগের গান, কখনো ভুলা যাবে না!!। হ্যাঁ,আমরা আজও সেই ভাষা শহীদদের ভুলতে পারিনি। তাদের স্মরণ করছি প্রতিনিয়ত। আর সেইসঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারি আসলে আরো বেশি তাদের স্মরণ করি। আজকের তরুণ সমাজ কী ভাবছেন এই ২১ ফেব্রুয়ারি ও আমাদের ভাষা নিয়ে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন—
আমজাদ হোসেন ফাহীম
পৃথিবীর বুকে অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং নবজাতকের মুখের প্রথম শব্দ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে আমার প্রিয় ভাষাটি। প্রতিবছর এই দিনটার জন্য মুখিয়ে থাকি এবং ভোরবেলায় শহীদের বেদীতে ফুল দেয়ার মাঝে খুঁজে পাই শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারদের। গুটিকয়েক শব্দ দিয়ে কখনো এর তাত্পর্য তুলে ধরা যাবে না। কারণ এর বিশালতা সমুদ্রের মত সীমাহীন, দীপ্ত শিখার মত উজ্জ্বল। আমার বিশ্বাস ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ নয়, অনন্তকালের প্রত্যেকটা দিন এদেশের তরুণ সমাজ কিংবা আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার কাছে এর তাত্পর্য বহমান থাকবে।
—সাইফুল ইসলাম আফরাদ
৪র্থ বর্ষ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
আমাদের মাতৃভাষা খুবই সমৃদ্ধ। অথচ একুশ শতকে এসে আমরা আমাদের মায়ের ভাষাকে ভুলে ইংরেজি, হিন্দি ভাষার প্রতি ঝুঁকে পড়ছি। বাবা-মা’র মতো এমন শ্রুতিমধুর শব্দের প্রতিস্থাপন হয়েছে মম-ড্যাড দ্বারা। আজকালকার ছেলেমেয়েরা কথায় কথায় ইংরেজি আর হিন্দি বলে, গান শুনে, সিনেমা দেখে নিজেদের ওভারস্মার্ট ভাবা শুরু করেছে। আর যারা বাংলায় কথা বলে, বাংলা গান শুনে, বাংলা সিনেমা দেখে তদেরকে বলে আনস্মার্ট, গেঁয়ো, ক্ষ্যাত। অনেক রক্তে কেনা আমার মায়ের ভাষা।
—মনিরুজ্জামান
লেভেল ৩, টার্ম ২, যন্ত্রকৌশল বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আসলে মনে করিয়ে দেয় সেইসব তরুণ ভাষা শহীদদের কথা যাঁরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে নিজেদের প্রাণ দিয়েছিল। পাকিস্তানিরা আমাদেরকে শাসন ও শোষণ করতে আমাদের মাতৃভাষাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু তরুণরা তা হতে দেয়নি। তারা মায়ের ভাষাকে রক্ষার জন্য বাংলার রাজপথকে রঞ্জিত করেছিল আর এভাবেই তারা বাংলা ভাষা ও তার ইতিহাসকে করেছে মহান। এই ভাষায় কথা বলতে পারায় আমি সত্যিই গর্বিত।
—সুমাইয়া আলী (সুমু)
১ম বর্ষ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
২১ ফেব্রুয়ারির জন্য পেয়েছি এই মুখের বুলি। ইতিহাসের সেইদিনে ভঙ্গ করে পাকিস্তানের ১৪৪ ধারা শহরের অলিগলি থেকে ছুটে আসা তরুণ ছাত্র নেতাদের ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ জোরালো প্রতিবাদের প্রতিধ্বনিতে কেঁপে উঠেছিল ঢাকার শহর। স্মৃতিবিজড়িত এই গৌরবোজ্জ্বল দিনটি বাঙালি হিসেবে আমাদের শুধুমাত্র অংশ না বরং সাহসিকতা অর্জনের অংশ।
—শহীদুল হক সৌরভ
৩য় বর্ষ, টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভের পাশাপাশি বাংলাদেশের গুরুত্বও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের মাধ্যমে বিশ্ববাসী অনুভব করতে সক্ষম হবে, মাতৃভাষা একটি দেশের জাতিসত্তার প্রধান বিবেচ্য বিষয়। তাই মাতৃভাষার উপর যখনই কোনো আঘাত আসবে, তখনই তারা আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠবে মাতৃভাষাকে রক্ষা করার জন্য।
—নূরে জান্নাত বিনতে নাহার
৩য় বর্ষ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা।
তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ভাষার সোনালী অতীত এবং স্বকীয়তা ভুলতে বসেছে! তাই একজন তরুণ হিসেবে আমি মনে করি, প্রভাতফেরীতে অংশগ্রহণ এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বাংলা ভাষা ও শহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন হয় না। বরং ভাষা শহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ এবং তাদের চেতনাকে বুকে ধারণ করে আমাদের সকল তরুণদের বাংলা ভাষা রক্ষা এবং বিকৃতির কবল থেকে মুক্ত করার প্রয়াসে এগিয়ে আসতে হবে।
—সাব্বির আহমেদ আসিফ
লোক প্রশাসন বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস।
একুশ শুধু চেতনায় নয়, চর্চায় চাই একুশের প্রতিফলন। ফেব্রুয়ারি মাসে অমর একুশে বইমেলা মনে করে দেয় শহীদদের ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার গর্বিত গল্পের। মায়ের ভাষায় মায়ের কাছে চিঠি লেখা, ভাষা প্রতিযোগ, বাংলাবিদের মত বাংলা ভাষা বিকশিত হওয়ার মত প্রতিযোগিতা আয়োজন হোক। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ভাষাই হোক এগিয়ে চলার সঞ্জীবনী শক্তি।
—মোঃ ইসমাইল হোসেন
৩য় বর্ষ, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
একুশের শহীদদের রক্ত থেকেই নবজন্ম লাভ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। তাই একুশই হউক আমাদের জাতীয় সংকট সমাধানের প্রেরণা। যেহেতু শহীদ মিনার আমাদের ভাষা আন্দোলনের প্রতীক তাই আমার প্রত্যাশা, যারা সত্যিকার অর্থে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে লালন করে শহীদ মিনার যেন তাদেরই হয়।
—এফ মাহমুদ
ফার্মেসি বিভাগ, মাস্টার্স, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
