মহাকাশে প্রাণের সন্ধানে

বাংলাদেশি কন্যা

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:৩৯

তেলাপোকা নামক চিটচিটে অদ্ভুত কীটটি দেখে প্রায় সবাই আঁতকে উঠলেও এটির একটি বিশেষ ক্ষমতা আছে। শুঁড়ের সাহায্যে গন্ধ শুঁকে এক মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশের অবস্থা বুঝে নিতে পারে কীটটি। বলা হয়, ডায়নোসরের আগে থেকেও পৃথিবীতে তেলাপোকা ছিল, হাজার বছর আগে ডায়নোসর বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তেলাপোকা এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে, তা কেবল তার এই আশ্চর্য ক্ষমতার কারণেই। বিজ্ঞানীরা ভাবতেন এমন ক্ষমতা দিয়ে যদি ক্ষুদ্র কিছু তৈরি করা যায়, তবে তা যেকোনো পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারবে। বিশেষ করে মহাকাশের বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রে প্রাণের সন্ধানে এটি দারুণ কার্যকরী হবে। এবার সেটিকে বাস্তবে পরিণত করেছেন নাসায় কর্মরত বাংলাদেশি তরুণী মাহমুদা সুলতানা।

আকারে অতিক্ষুদ্র হওয়ায় বস্তুটিকে প্রায় দেখা যায় না, অথচ প্রাণ বা উপাদানের সন্ধান করার দারুণ ক্ষমতা আছে, এমনই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন মাহমুদা। তার উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তিটির নাম থ্রিডি-প্রিন্টেড সেন্সর টেকনোলজি। এটি আগামীতে চাঁদ ও মঙ্গলে মহাকাশচারীদের সঙ্গে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠবে। দারুণ এই উদ্ভাবনে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন এই তরুণী, যার জন্ম আর শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের পাবনা জেলার এক অজপাড়াগাঁয়ে।

কম চাপ ও তাপমাত্রায় কোনো গ্যাস সামান্য পরিমাণে থাকলেও তার মধ্যে প্রাণের উপাদান লুকিয়ে আছে কি না, গন্ধের মাধ্যমে সেটি শনাক্ত করতে পারবে থ্রিডি-প্রিন্টেড সেন্সর টেকনোলজি। সেন্সরটি গন্ধের মাধ্যমে কী খোঁজখবর পেল, তা অ্যান্টেনার সাহায্যে গ্রাউন্ড স্টেশনে যোগাযোগ রেখে চলা উপগ্রহকে জানাবে। অনেক আগে থেকেই এমন প্রযুক্তির প্রয়োজন ছিল নাসার। মাহমুদাই সেটি তুলে দিলেন নাসাকে।

মাহমুদা জানিয়েছেন, এটি মূলত একটি প্রিন্টার। থ্রিডি-প্রিন্টেড সেন্সরে কালির বদলে লাগানো হয় বিভিন্ন ধরনের ন্যানো পদার্থ। সেগুলো গুঁড়া অবস্থায় থাকে। অন্যান্য পদার্থকে গুঁড়া করলে দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু ন্যানো ম্যাটেরিয়ালকে গুঁড়া করলে তা অনুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা সম্ভব না। সেন্সরটি অনেকটা আঙুলের মতো—লম্বায় ৩ ইঞ্চি ও চওড়ায় ২ ইঞ্চি। এর আগে মহাকাশে এত ছোট সেন্সর পাঠানো হয়নি। তিনি আরও জানান, এটি মঙ্গল বা চাঁদে পাঠানো কোনো মহাকাশচারীর শরীরে গুঁজে দেওয়া যাবে। ভিনগ্রহে গ্যাসে বা বাতাসে প্রাণের উপস্থিতি আছে কি না, সেই গন্ধ পেয়ে যাবে চোখের পলকেই। নাসার বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি বৈপ্লবিক বলছেন।

বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ডে অবস্থিত নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে কর্মরত আছেন। পাবনার গ্রামে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পরেই মা, বাবার সঙ্গে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেন। পরে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন নাসায় কাজ করবেন। দেশে থাকতেও পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে নাসা সম্পর্কিত খবরাখবরে চোখ রাখতেন। অন্য যে কারওর চেয়ে তিনি অনেক বেশি দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন বলেই স্বপ্নপূরণের সুযোগ আসে জীবনে। ২০১০ সালে নাসায় যোগ দেওয়ার পর থেকে মাহমুদা সেখানেই কাজ করছেন। এর আগে ২০১৭ সালে ন্যানো ম্যাটেরিয়াল নিয়ে গবেষণা ও মহাকাশে ক্ষুদ্র ও যুগান্তকারী ডিটেক্টর ও ডিভাইস তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য মাহমুদাকে  ‘আইআরএডি ইনোভেটর অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।