দেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান চিত্র ভবিষ্যতের জন্য এক ‘অশনি সঙ্কেত’। যেখানে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের এমন করুণ অবস্থা সেখানে শিশুতোষ চলচ্চিত্র উপেক্ষিত হওয়ার খবর স্বাভাবিক মনে হতে পারে!
স্বাধীনতার পর ঢালিউডে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে নির্মাতাদের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়। এই ধারাবাহিকতা আশির দশক পর্যন্ত অব্যাহত থাকলেও এরপর এতে ভাটা পড়ে। ক্রমেই হ্রাস পেতে থাকে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ।
স্বাধীন বাংলাদেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম প্রয়াস হিসেবে টেনে আনা যায় ১৯৭৮ সালে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘ডুমুরের ফুল’ সিনেমাকে। তবে একেবারে হাত-পা ঝেড়ে নিঃসন্দেহে শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে অবিহিত করা যায় ১৯৮০ সালে বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দাবাহিনী’। একই বছর নির্মিত হয় আজিজুর রহমানের ছুটির ঘণ্টা এবং শেখ নজরুল ইসলাম পরিচালিত এতিম। এরপর নির্মিত হয় আরো বেশকিছু সাড়া জাগানো শিশুতোষ চলচ্চিত্র। এরমধ্যে মোরশেদুল ইসলামের দীপু নাম্বার টু, শেখ নজরুল ইসলামের মাসুম, সি বি জামানের পুরস্কার, শহীদুল আমিনের রামের সুমতি অন্যতম।
একজন নির্মাতা অনেকগুলো শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, বাংলাদেশে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন একমাত্র মোরশেদুল ইসলাম। তিনি দেশের শিশুদের একের পর এক উপহার দিয়েছেন দীপু নাম্বার টু, দূরত্ব, আমার বন্ধু রাশেদ, আঁখি ও তার বন্ধুরা। তার সবগুলো চলচ্চিত্রই বেশ প্রশংসা পায়। তবুও তিনি হতাশ। এই নির্মাতা বলেন, ‘শিশুতোষ চলচ্চিত্র দিনদিন কমছে। শিশুদের ছবি কেউ দেখে না বলেই এই অবস্থা। ছোটদের নিয়ে অভিভাবকরা এসব ছবি হলে গিয়ে দেখলে এমন অবস্থা দেখতে হতো না।’
২০০৯ সালে তৈরি করা হয় দেশের প্রথম ডিজিটাল শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘দূরবীন’। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস দূরবীনের আলোকে নির্মিত এই ছবিটির জন্য পরিচালক জাফর ফিরোজ মুম্বাই ফিল্ম একাডেমি থেকে আন্তর্জাতিক ক্যাটাগরিতে সেরা চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর হাতেগোনা কয়েকটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সর্বশেষ গতবছরের নভেম্বরে আসিফ ইসলাম ও ফয়সাল রদ্দি নির্মিত শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘পাঠশালা’ মুক্তি পায়। শিশু বিনোদনের লক্ষ্যে নির্মিত চলচ্চিত্রটি দর্শকমহলে বেশ প্রশংসিত হলেও লাভজনক অবস্থানে পৌঁছায়নি।
শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘এখনতো বাণিজ্যিক ছবিই কম নির্মিত হচ্ছে। প্রযোজকরা কোনো ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন না, কারণ তারা লগ্নি করে অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই শিশুদের ছবি কমছে। তবে শিশুদের ছবি নির্মাণ কমকে থাকলে সমাজেরই বিপদ।’
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এযাবত্ পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য মিলিয়ে প্রায় ২০টি শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে। অন্যদিকে তথ্য মন্ত্রণালয় প্রতি অর্থবছর চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান দেয়। সেখানে একটি শিশুতোষ ছবিকে অনুদান দেওয়ার কথা। মানিক মানবিকের শোভনের স্বাধীনতা, মান্নান হীরার একাত্তরের ক্ষুদিরাম এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে এগুলোর প্রচার ও প্রসার তেমন ছিল না।
শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ নয়, শিশুদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য প্রেক্ষাগৃহও পাওয়া যায় না। বর্তমান সময়ে শিশুতোষ চলচ্চিত্রগুলো হাতেগোনা কয়েকটি হল পায়! চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ভালোমানের সিনেমা হলের সংখ্যা না থাকার মতো। অভিভাবকরা মানসম্মত হল ছাড়া শিশুদের নিতে চায় না।
তবে কয়েকটি চলচ্চিত্র উত্সবের কল্যাণে দেশি-বিদেশি নানা সিনেমা দেখার সুযোগ পায় শিশুরা। সবচেয়ে বড় আয়োজনটি শিল্পকলা একাডেমির। এছাড়া চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশের আয়োজনে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সব অনুষ্ঠিত হয়।
