কাভার্ড ভ্যানের চালকের বিরুদ্ধে মামলা

কমলাপুরে ট্রেন-কাভার্ড ভ্যান সংঘর্ষে নিহত ৬

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৪, ২০:৩৮
 
 
রাজধানীর কমলাপুর কনটেইনার ডিপোতে রেল স্টেশনমুখী একটি ট্রেনের সঙ্গে একটি কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ১১ জন। এর মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন সাতজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
রেল পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, সোমবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা তুরাগ এক্সপ্রেক্স নামের ট্রেনটি কমলাপুর রেল স্টেশনে ঢোকার মুখে কাভার্ড ভ্যানটি সামনে পড়লে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, কাভার্ড ভ্যানের চালক হয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, নয়তো তার গাফিলতি ছিল। তবে ‘অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্ট’। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই দুর্ঘটনায় নিহত ৬ জনের মধ্যে ঘটনাস্থলেই দুই জন এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর আরো ৪ জনের মৃত্যু হয়।
নিহতদের মধ্যে ৩ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নাঈম সিকদার (১৬) নামে এক কিশোর ঘটনাস্থলেই মারা যায়। সে ট্রেনের যাত্রী ছিল। তার পিতা মো. ইউনুস আলী। বরিশালের বাকেরগঞ্জ তাদের বাড়ি। নাঈমের খালু আবদুর রশিদ লাশ সনাক্ত করেন। সে মুগদার একটি মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে পড়ত বলে বলে তার খালাত ভাই মাহফুজ হাসপাতালে জানিয়েছেন।
হাসপাতালে মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে দুই জনের পরিচয় মিলেছে। এরা হলেন— মজিবুর রহমান (৫৫)। পিতা মৃত আবদুল হক। তিনিও ট্রেন যাত্রী ছিলেন। বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং। তার স্ত্রী সখিনা বেগম জানান, তারা মিরপুর শিয়ালবাড়ি ৭ নম্বর রোডে থাকেন। তিনি বিভিন্ন ব্যানারের সঙ্গে যে বাশের টুকরো লাগানো হয় তার ব্যবসা করতেন। এই বাশ কেনার জন্যই নারায়নগঞ্জ গিয়েছিলেন।
অন্যজন আলমগীর হোসেন (৫০)। তার ঠিকানা পাওয়া যায়নি। অজ্ঞাত নিহত তিনজনের মধ্যে এজজন নারী (৩০)। তার পরনে লাল স্যালোয়ার ও কামিজ পরা। নিহত অন্য দুই জন পুরুষ।
যেভাবে ঘটে এই দুর্ঘটনা:
তুরাগ এক্সপ্রেসে করে নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর আসছিলেন একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী শফিকুল ইসলাম। তিনি ছিলেন ইঞ্জিনের পেছনের বগির ছাদে। ঘটনাস্থলে তিনি জানান, ট্রেনটি যখন স্টেশনের আগে কনটেইনার ডিপোতে ঢোকে এন এস কার্গো সার্ভিস নামের কাভার্ড ভ্যানটি তখন পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যাচ্ছিল। গতিও খুব বেশি ছিল না। কিন্তু ট্রেন দেখেও চালক কাভার্ড ভ্যান না থামিয়ে এগিয়ে গেলে ইঞ্জিনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এবং কাভার্ড ভ্যানটি ঘুরে গিয়ে ইঞ্জিনের পেছনের বগিতে সজোরে আঘাত করে। এতে কাভার্ড ভ্যানের সামনের একটি অংশ ট্রেনের বগির মধ্যে ঢুকে পড়ে। ওই অবস্থায় কাভার্ড ভ্যানটিকে প্রায় ৫০ গজ ছেঁচড়ে নিয়ে ট্রেনটি থেমে যায়। এ সময় ট্রেনের ইঞ্জিনের পেছনে থাকা বগি ও ছাদের চড়া যাত্রীরা আহত হন।
কন্টেইনার ডিপোর ভেতরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটি দেকেছেন মিজানুর রহমান। তিনি জানান, ডিপোর আনসার সদস্যরা ট্রেন দেখে কাভার্ড ভ্যানটির চালককে থামার সংকেত দিয়েছিলেন। কিন্তু চালক না থামিয়ে ট্রেনের লাইন পার হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এরপর চোখের পলকে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। ইঞ্জিনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর কাভার্ড ভ্যানটি ছিটকে এসে ধাক্কা দিলে পেছনের বগিটি কাত হয়ে লাইনে পড়ে যায়। ওই অবস্থায় ট্রেন আরো এগিয়ে যাওয়ায় কাভার্ড ভ্যানের চেসিস পুরো ভেঙে যায় এবং ট্রেনের বগির একপাশের দেয়াল ভেঙে দুমড়ে যায়। তিনি বলেন, যারা আহত-নিহত হয়েছেন তাদের অধিকাংশই ট্রেনের যাত্রীর ছিলেন।
কমলাপুর আইসিডি পরিদর্শক ফজলুল হক চৌধুরী ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানান, এখানে ট্রেন চলাচলের সময় ঘন্টা বাজানো হয়। একটি লাল বাতিও জ্বলে। এর পাশাপাশি আনসারের দু’জন সদস্য টার্মিনালের গেটে দায়িত্বে থেকে কাভার্ড ভ্যানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন। তার দাবি, ঘটনার আগে হান্নান ও মিজান নামের আনসারের দু’জন সদস্য কাভার্ড ভ্যানটির চালককে থামানোর সংকেত দেন। কিন্তু চালক তা অমান্য করেন এবং গাড়িটি থামাননি। দুর্ঘটনায় আনসারের ওই দুই সদস্যও আহত হয়েছেন।
হাসপাতালে আহত ও ক্ষতিপূরণ:
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর ড. মুশফিকুর রহমান জানান, হাসপাতালে বর্তমানে চিকিত্সাধীন রয়েছেন ৭ জন। তারা হলেন রিক্সা চালক জাবেদ আলী (৪৫), আনসার সদস্য মিজানুর রহমান (২৫), প্রাইভেট কার চালক মো. বাবুল (৪৩), তিতাস পরিবহরের ড্রাইভার জিন্দার মোল্লা (৪০) ও গেন্ডারিয়ার একটি ওয়ার্কশপের কর্মচারী হারুন অর রশীদ (৩৫) এবং রড মিস্ত্রী বিল্লাল হোসেন (২৫) ও মোস্তফা প্রধান (২৫)।
রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে রিক্সা চালক জাবেদ আলীকে ১৮ হাজার এবং মিজানুর রহমান, মো. বাবুল, জিন্দার মোল্লা ও হারুন অর রশীদকে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দিয়েছেন।
অন্য দুই জন বিল্লাল হোসেন ও মোস্তফা প্রধানকে তিনি দেখতে যাননি বা কোন ক্ষতিপূরণও দেননি। এছাড়া কালাম (৩২), মিলন (৪৫) ও নাসির (২২) নামে তিনজন প্রাথমিক চিকিসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
চিকিত্সার খরচ দেবে রেলমন্ত্রণালয়:
হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, আহতদের চিকিত্সার খরচ রেল মন্ত্রণালয় বহন করবে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে দেখতে রেলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা নাজমুল হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি:
ট্রেন দুর্ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। কমিটিকে দ্রুত রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে দুর্ঘটনার পর এই কমিটি গঠন করা হয়। কমলাপুর রেলওয়ে থানা পুলিশের ওসি আব্দুল মজিদ জানান, বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (বিপিও) নাজমুল হাসানকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন— বিভাগীয় মেকানিক্যাল প্রকৌশলী সাদিকুর রহমান ও বিভাগীয় প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আরিফ। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
কাভার্ড ভ্যানের চালকের বিরুদ্ধে মামলা :
কমলাপুর ট্রেন দুর্ঘটনার দায়ে কাভার্ড ভ্যানের চালককে আসামি করে রেলওয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে চালক পলাতক রয়েছে। গতকাল বিকেল চারটায় রেলের প্রকৌশলি আব্দুল মতিন মন্ডল বাদি হয়ে কমলাপুর রেলওয়ে থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল মজিদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কাভার্ড ভ্যানের চালকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তবে দোষি চালককে আটক করা যায়নি। দুর্ঘটনার সময় কাভার্ডভ্যানটি হেল্পার চালাচ্ছিল বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। এনএস কার্গো সার্ভিসের ওই কাভার্ড ভ্যানটি অফিসের ঠিকানা ৬২/১ উত্তর কমলাপুর। ঘটনার পর ওই অফিসে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। মালিকের ফোনে বারবার ফোন দিলেও কেউ রিসিভ করেননি।