গত কয়েক বত্সর ধরিয়াই ঢাকার কয়েকটি এলাকায় বলিতে গেলে সারা বত্সরই গ্যাসের সংকট দেখা যাইতেছে। বস্তুত সমগ্র দেশেই গ্যাসের সংকট দিনকে দিন প্রবল হইতেছে। বিশেষত কলকারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হইতেছে, এমনকি সার ও বিদ্যুত্সহ সরকারি ও বেসরকারি অনেক কারখানায় মাঝেমধ্যে উত্পাদন বন্ধও রাখিতে হইতেছে। পাশাপাশি, শহরাঞ্চলের অনেক বাড়িতে এখন রান্না করা দায় হইয়া পড়িয়াছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক ৩৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হইতেছে ২৭৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাত্ দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকিয়া যাইতেছে। কিন্তু অন্যদিকে, প্রতি বত্সর ১০ শতাংশ হারে গ্যাসের চাহিদা বাড়িতেছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিদেশ হইতে গ্যাস আমদানি শুরু করিয়াছে।
গ্যাসের মওজুদ বিষয়ে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে বিদ্যুত্, জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সংসদে তথ্য দিয়াছিলেন, উত্তোলনযোগ্য নিট মওজুদের পরিমাণ ১২.৫৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এই হিসাব এক বত্সর আগের। এখন মওজুদ আরও কমিয়াছে। প্রশ্ন হইল, এই গ্যাস দিয়া কতদিন চলিবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একজন সাবেক অধ্যাপক বলিয়াছেন যে, বাংলাদেশে এখন গ্যাসের মওজুদ আছে ১২ টিসিএফ। কিন্তু প্রতি বত্সর এক টিসিএফ গ্যাস ব্যবহার হইতেছে। এই হিসাবে আগামী ১২ বত্সর চলিবার কথা। কিন্তু অপচয়ের কারণে যে পরিমাণ গ্যাস এখন মওজুদ আছে তাহা দিয়া ১০ বত্সরের বেশি চলিবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সংকট হইতে মুক্তির উপায় আছে দুইটি। প্রথমত, বিদেশ হইতে এলএনজি গ্যাস আমদানি করা, যাহা সরকার ইতোমধ্যেই শুরু করিয়াছে। দ্বিতীয় উপায়টি হইল, নূতন গ্যাসক্ষেত্র খুঁজিয়া বাহির করা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, বড় ধরনের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হইবার জায়গা হইল গভীর সমুদ্র। ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হইলেও সমুদ্রে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের জন্য অনুসন্ধান চালানো হইতেছে না। কিন্তু, সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পরে মিয়ানমার ইতোমধ্যেই গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করিয়াছে। আমাদেরকেও সেই পথে অগ্রসর হইতে হইবে। কারণ, এখন প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করা হইতেছে তাহা চাহিদা মিটাইবার জন্য পর্যাপ্ত নহে।
উপরন্তু যে-কথাটি না বলিলেই নয় সেইটি হইল, রাজধানীতে গ্যাস সমস্যার অন্যতম বড় কারণ অবৈধ সংযোগ ও গ্যাসের যথেচ্ছ অপচয়। জানা যায়, ঢাকা ও ইহার আশপাশে চার হইতে পাঁচ লক্ষ অবৈধ গ্যাস সংযোগ আছে। প্রতিদিন ৪০ হইতে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস অবৈধ পথে অপব্যবহূত হইতেছে। কলকারখানাগুলিতে তো বটেই, এমনকী গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় আবাসিক খাতেও গ্যাসের অবৈধ ব্যবহার বাড়িতেছে। মাঝেমধ্যে তিতাস অভিযান চালাইয়া এসকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিলেও প্রভাবশালীরা একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় আবার অবৈধ সংযোগ চালু করে। ফলে বৈধ গ্রাহকেরা বঞ্চিত হইতেছেন। অন্যদিকে, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিতে ৫০ হইতে ৬০ শতাংশ দক্ষতার বয়লার ব্যবহূত হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড হইল ৮৫ শতাংশ। ফলে, বিপুল পরিমাণ গ্যাসের অপচয় হইতেছে। গ্যাসের অপচয় ও অবৈধ সংযোগ বন্ধে সরকারকে আরও কঠোর হইতে হবে। সেইসঙ্গে, গ্যাসের অপচয় ঠেকাইতে কলকারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করিতে হইবে। তাহা হইলে গ্যাসের সংকট ও অপচয় অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে আনা যাইবে বলিয়া আমরা মনে করি।
