ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণা আমেরিকা ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য-দ্বন্দ্ব প্রশমন ও বিশ্ববাণিজ্যের আতঙ্ক প্রশমনে কিছুটা হইলেও কাজ করিতে শুরু করিয়াছে। রবিবার প্রদত্ত এক টুইটবার্তায় উভয় দেশের মধ্যে কয়েকদিন ধরিয়া চলমান আলাপ-আলোচনা দারুণ ফলপ্রসূ হইয়াছে বলিয়াও দাবি করিয়াছেন ট্রাম্প। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চীনা পণ্যের উপরে আরোপ হইতে যাওয়া দুইশত বিলিয়ন ডলার শুল্ক আরোপের বিষয়টিও স্থগিত করিয়াছেন তিনি। আগামী শুক্রবার হইতে এই শুল্ক আরোপ শুরু হইবার কথা ছিল। চীনের সরকারি বার্তা-সংস্থা শিনহুয়ার খবরেও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিবার বার্তা দেওয়া হইয়াছে। শিনহুয়ার মতে, বিবাদ-মীমাংসার পথে উভয় পক্ষ একধাপ অগ্রসর হইতে সক্ষম হইয়াছে। দুইপক্ষ হইতে ইতিবাচক খবর আসিবার সরাসরি ফল দেখা যাইতে শুরু করিয়াছে বেশকিছু স্টক এক্সচেঞ্জে। বিশেষ করিয়া ট্রাম্পের ঘোষণার পরে সোমবার সকাল হইতেই জাপান, কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার শেয়ার বাজারে তেজীভাব পরিলক্ষিত হইতে থাকে। উল্লেখ্য, পারস্পরিক দোষারোপ ও হুমকির চূড়ান্ত পর্যায়ে গত ডিসেম্বর মাসে দুইপক্ষ ৯০ দিনের বাণিজ্য-যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হইয়াছিল। বিরতি শেষ হইবার মেয়াদ যত ঘনাইয়া আসিতেছে বিশ্ব-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ততই নানাবিধ আশঙ্কার কালো মেঘ যেন ঘনাইয়া আসিতেছে। বস্তুত আমেরিকা ও চীনের বাণিজ্য দ্বন্দ্বের জেরে বিশ্ব-বাণিজ্যের গতি গত কিছুদিন ধরিয়া কিছুটা ধীরগামী হইয়া পড়িয়াছে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-বিরোধের কারণ একটি বা দুইটি নহে। মেধাস্বত্ব আইন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, সাইবার-অপরাধ, কৃষি, সেবাখাত, মুদ্রাসহ অনেকগুলি বিষয়ে আমেরিকা চীনকে অভিযুক্ত করিতেছে। চীন এই সকল অভিযোগ টানা অস্বীকার করিয়া আমেরিকার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণার অভিযোগ করিতেছে। গত ডিসেম্বরে বিরতির পূর্ব পর্যন্ত এই দ্বন্দ্বকে ঘিরিয়া চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অধিক শুল্ক আরোপ করিয়াছে। পক্ষান্তরে, পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে আমেরিকার পণ্যের উপরে চীন ১৩০ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আরোপ করিয়া দিয়াছে। দুই পরাশক্তির মধ্যে চলমান বাণিজ্য-যুদ্ধের কারণে বিশ্ব-অর্থনীতি সংকটে পড়িয়া যাইতেছে বলিয়া জানাইয়া দিয়াছে আইএমএফ।
বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার চলমান আলোচনা হইতে উত্সাহিত হইবার কারণ থাকিলেও, এই দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য-দ্বন্দ্বকে নিছক একটি বাণিজ্য-দ্বন্দ্ব হিসাবে দেখাটা ভুল হইবে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যকার রাজনৈতিক উপাদানগুলি ভালোভাবে বুঝিবার উপরে গুরুত্ব আরোপ করিতেছেন তাহারা। উদাহরণস্বরূপ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্ব হইতেই চীনবিরোধী প্রচারণাকে একটি বিশেষ মাত্রায় লইয়া যাইতে শুরু করেন ট্রাম্প। আমেরিকায় কর্মসংস্থান কমিয়া যাইবার পিছনে চীনের নিম্নমানের সস্তা পণ্যকে দায়ী করিয়া মূলধারার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষজনের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন তিনি। ক্ষমতায় আসিবার পরও অনেক সময় তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই চীনকে অভিযুক্ত করিতে থাকেন ট্রাম্প। সাধারণ ভোটারদের নিজের পক্ষে রাখিবার এই কৌশলের কারণেই ট্রাম্প সবসময় একধরনের চীনবিরোধী অবস্থান লইয়া চলিবেন বলিয়া মনে হইতেছে। পক্ষান্তরে, বিশ্বের নূতন পরাশক্তি হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করিবার ইচ্ছা-তাড়িত হইয়া চীন অন্য সকল ক্ষেত্রের মতো বাণিজ্য ক্ষেত্রেও আমেরিকার বিরুদ্ধে একধরনের লড়াই জারি করিয়া রাখিতে চাহিলে অবাক হইবার কিছু থাকিবে না।
