অনেকে বলে, যুক্তি এখন বাহুতে আশ্রয় নিয়েছে। যুক্তিতর্কে পেরে উঠতে না পারলে হাত চলে যায় সামনে। পেশিশক্তির দাপটে জিহ্বার শক্তি পরাজিত। তাই কেউ কেউ বলেন, বর্তমান যুগটা আসলে ‘অযৌক্তিকতার যুগ’ (এইজ অব আনরিজনিং), আবার কেউ কেউ বলেন, এটা ‘অসততার যুগ’ (এইজ অব ডিজঅনেস্টি), আর আমি বলি— এটা ‘অসত্যের যুগ’ (এইজ অব আনট্রুথ)। চারদিকে মিথ্যার/অসত্যের টক্সিন ছড়ানো-ছিটানো। মিথ্যার টক্সিন ভাইরাসের মতো, ছড়ায় চারদিকে দ্রুতগতিতে, আক্রমণ করে সবাইকে সমহারে, লণ্ডভণ্ড করে দেয় ব্যক্তি-সমাজকে, গড়ে তোলে মিথ্যা শিক্ষায় ‘অশিক্ষিত’ এক মানবজাতি।
সত্য শুধু এদেশ থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে না, সত্য নিরুদ্দেশের পথে সব দেশে। রাশিয়ার একজন লেখক পিটার পোমারানসেভ তো একটা আস্ত বই-ই লিখে ফেলেছেন এ বিষয়ে: Nothing is True and Everything is Possible. ব্যবস্থাপনা গুরু নামে বিশ্বআদৃত লেখক পিটার ড্রাকার বলেছেন: আমরা মানব ইতিহাসে সবচেয়ে আলোড়িত সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে বসবাস করছি। দুঃখজনক হলো, আমরা অভাবনীয় সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হচ্ছি, এটিকে খুঁজে বের করার কোনো রকম গাইডপোস্ট ছাড়াই। আমরা কোনো পরিবর্তনকে বন্ধ যেমন করতে পারি না, তেমনি এটাকে মন্থরও করে দিতেও পারি না। তবে আমরা সঞ্চালক (অ্যাংকর) খুঁজে বের করতে পারি পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য। আর এ ‘সত্য’ হলো এরূপ একটি সঞ্চালক। কিন্তু আমরা সত্যের চেয়ে ‘অভিমত’-কে অগ্রাধিকার (প্রিফারেন্স) দিচ্ছি, যার ফলে আমরা নিজের সুবিধামতো অবস্থান বদল করতে পারছি। এটি সত্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
ব্যক্তিগত অগ্রাধিকার মানে হলো আমাদের চিন্তাভাবনা করার দরকার নেই, আমাদের অজনপ্রিয় হওয়ার মানে নেই, কোনো কিছুর ব্যাপারে মাথা ঘামানোর দরকার নেই, আমরা সেন্টিমেন্টের উপর ভর করে দিন কাটিয়ে দিতে পারি। সত্যের উপরে আমাদের ভাবাবেগ আর অভিমত স্থান দখল করে আছে। আমরা এ কাজটি করে ফেলেছি। আমরা সত্যের ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। নিজের ভাবাবেগ দ্বারা মোহিত হয়ে আমরা পরস্পর বিরোধী জিনিস কামনা করি। আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি কিন্তু কেউ আমাদের পথ দেখাক তা চাই না। আমরা বিচার চাই, রায় চাই না। আমরা ফলাফল চাই, শৃঙ্খলা চাই না। আমরা ভালোবাসা চাই কিন্তু অন্তর্মুখী হয়ে থাকি। আমরা সহনশীলতা চাই, মতপার্থক্য পছন্দ করি না। আমরা ঐক্য চাই, আবার একা চলতে পছন্দ করি। আমরা সমাধান চাই, আবার মনে করি কোনো কিছুই অকাট্য নয়। আমরা সত্য বলতেই শুধু ভয় পাই না, আমরা সত্য শুনলে অনেক সময় তা বেয়াদবি মনে করি।
সত্যের আওতা অনেক ব্যাপক। এর মধ্যে রয়েছে শৃঙ্খলা, দায়িত্বশীলতা, চরিত্র, বিশ্বাস আর নীতি। স্বাভাবিক কারণেই এগুলো খুবই কঠিন বিষয়। এগুলোকে গর্তে ঝেঁটিয়ে ফেলে দিতে সত্য আমাদেরকে সমর্থন দেয় না। সত্য দেয় নির্মলতা আর স্পষ্টতা। আমাদের চারপাশে যা কিছুই ঘটুক না কেন, সঞ্চালক পয়েন্ট (ভরসার পাত্র) হিসেবে, সত্য আমাদেরকে রাস্তা দেখায়। সত্য কাটে, রক্ত ঝরায়, আঘাত করে ঠিকই, কিন্তু এ সত্যই আমাদেরকে এমন বন্ধনে আবদ্ধ করে যা ‘ভাবাবেগ আর অভিমত’ কখনও পারে না। আমরা যখন সত্য বলার পর ‘কিন্তু’ শব্দটি দিয়ে আরও কিছু বলার/মোডিফাই করার চেষ্টা করি, তখন আমরা নিজের অজান্তেই ভাবাবেগ আর অভিমতকে সত্যের উপরে স্থান দিয়ে দেই। উন্নয়নের, বেঁচে থাকার, অগ্রগতির, এগিয়ে যাওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে সত্যকে অধিষ্ঠিত করতে না পারলে সভ্যতার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। গণতন্ত্রের আবশ্যকীয় সম্পদও হলো সত্যচর্চা।
সত্য আবিষ্কারের বিষয় নয়; উদঘাটনের বিষয়। সত্য তো সত্যই। একে খুঁজে বের করা মানুষের কাজ, দায়িত্ব। মাধ্যাকর্ষণের বিষয়টি যখন মানুষের গোচরে আসে, তখন তা চিরসত্য বলে আমরা মেনে নিয়েছি। যতদিন মাধ্যাকর্ষণ সম্পর্কে আমরা জানতাম না তখনও মাধ্যাকর্ষণ তো ছিলই; ছিল যে এটাই সত্য। নিউটন শুধু সত্যটা উদঘাটন করেছিলেন। এ সত্যকে লুকানোর কিছু নেই। সত্য সদা সত্য, সর্বত্র একইভাবে সত্য। দুই আর দুই যোগ করলে চার হয়, তা আজ যেমন সত্য কালও তেমনি সত্য ছিল, আগামীতেও সত্য হিসেবেই বিরাজ করবে মানবসমাজে। এক সময় মনে করা হতো, পৃথিবী সমতল। যখন মানুষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে উদঘাটন করলো যে পৃথিবী গোলাকার, তখন তা সত্য হিসেবে মেনে নিলো সবাই, সর্বসমাজে, সর্ব দেশে। যখন সমতল মনে করা হতো, তখনও পৃথিবী গোলাকারই ছিল, একথাও অস্বীকার করার কোনো যুক্তি নেই। কারণ সত্য সর্বকালেই সত্য। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, এ কথা সত্য সকল দেশের সকল মানুষের জন্য, সকল সময়ের জন্য।
আমরা দেখছি, সত্য প্রায় সর্বত্র পরাজিত হচ্ছে। সত্যের উপর নির্বিচারে নির্যাতন চলছে। ফেসবুক, টুইটার, ইমো, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ্সহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্বিচারে যার-তার আবেগতাড়িত মতামত আর নিজ নিজ মনোভাব যথেচ্ছভাবে ছড়িয়ে দিয়ে সত্যের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে অহরহ। আবেগ আর নিজস্ব বিশ্বাস কোনো ঘটনাকে পরিবর্তন করতে পারে না। কোনো ব্যক্তি অকপটে বিশ্বাস করতে পারেনা কোনো কিছু। কিন্তু সেটি যদি সত্য না হয় তাহলে তা একজন মাত্র ব্যক্তির ভুল। যারা তথ্যভিত্তিক পৃথিবীর সন্ধানে, তারা কীভাবে সত্যের উপর নির্যাতন মোকাবিলা করবে?
অপরাধী মন আর চিন্তা নিয়ে সত্যকথন কখনও সম্ভব নয়। অপরাধগ্রস্ত সমাজে সত্য রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে; সমতা ঢুকতে পারে না কখনও সত্যের জগতে। ধীরে ধীরে সত্য যেন আমাদের কাছে আগন্তুকের মতো হয়ে যাচ্ছে। সত্যকথনের গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে। তার স্থান দখল করে নিচ্ছে আবেগ আর ব্যক্তিগত বিশ্বাস। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা সত্য-উত্তর জগতে বসবাস করছি। সত্যকথনের চেয়ে মানুষ যেন ‘ফলাফলের যুক্তিযুক্ততা’কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। সত্য বলার জন্য নির্মল মন যেমন চাই, তেমনি নির্জলা চিন্তাও প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক সুস্বাস্থ্যের জন্য যেমন সত্যকথন প্রয়োজন, তেমনি ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর জন্যও একই জিনিস প্রয়োজন। ধর্মগ্রন্থগুলো দেখলেও আমরা দেখি, সত্যের উপর সব ধর্মই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে।
১৮৬০-৬৫ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ চলছিল। এমনি দুর্যোগকালে একদিন কথাচ্ছলে একজন ধর্মযাজক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে বললেন, আসুন আমরা জাতির এ দুঃসময়ে মহান ঈশ্বরের (আল্লাহ্র) নিকট প্রার্থনা করি যেন ঈশ্বর আমাদের পক্ষে থাকেন। প্রেসিডেন্ট মুচকি হেসে বললেন, ঈশ্বরকে নিয়ে আমি মোটেও চিন্তিত নই। আমি জানি, ঈশ্বর সব সময় ন্যায় আর সত্যের পক্ষে থাকেন। বরং আসুন, আমরা সবাই প্রার্থনা করি, এ জাতিটা যেন সব সময় ঈশ্বরের পক্ষে থাকে। ঈশ্বরের পক্ষে থাকা মানে সত্যের পক্ষে থাকা।
মানুষের হাতেই সত্য বিকৃত কিংবা বিড়ম্বিত হয়। এ কাজটি অনেক সময় কৌশলে অনেক মিডিয়া কর্মী করে থাকেন। একটা ছোট্ট কাহিনি বলি। একবার আন্তর্জাতিক এক কূটনৈতিক সম্মেলনে এক বিকেলের পরিবেশটাকে আনন্দময় করার জন্য রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় আমন্ত্রণ জানালেন। দুইজনে রাজি হয়ে ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় দৌড়ালেন। পরদিন লন্ডনের টাইমস পত্রিকা ওই দৌড় সম্পর্কে রিপোর্ট দিল: ব্রিটিশ ও রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের দৌড় প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত বিজয়ী হয়েছেন। একই দিন একই বিষয়ে রাশিয়ার ইজভেসতিয়া পত্রিকা রিপোর্ট করলো: বিভিন্ন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতায় রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত সর্বশেষ স্থানটির আগের স্থান অধিকার করেন। কথার প্যাঁচে সত্যকে কীভাবে বিভ্রান্তির বেড়াজালে আটকে ফেলা হলো! হরদম হচ্ছে এসব।
পৃথিবী জুড়ে চলছে তথ্য-যুদ্ধ। পুরো পৃথিবীটাই এখন নতুন নতুন আইডিয়ার মার্কেটপ্লেস। এখানে সত্য হারিয়ে যাচ্ছে। সত্যকে এ আইডিয়ার মার্কেটপ্লেসে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হবে। কীভাবে এ যুদ্ধে সত্য জয়ী হবে? শুধুমাত্র ঘটনাভিত্তিক/ ঘটনানির্ভর তথ্য বৈশ্বিক তথ্যযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়। নতুন কিছু ভাবতে হবে। এখন সোসাল মিডিয়া সবাইকে সুযোগ দিচ্ছে নিজের মতো করে বাস্তবতাকে তুলে ধরতে। সাবধান হতে হবে সবাইকে। সত্যকে আড়াল করার কাজটি এসব মিডিয়া করে খুবই সূক্ষ্মভাবে।
ধোঁকাবাজি মিথ্যারই নামান্তর। সমসাময়িক জীবনে ধোঁকাবাজি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি তথ্যসূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন (পাঁচ লক্ষ) আমেরিকান ভুয়া ডিগ্রি নিয়ে চাকরি করছে। জেনারেল একাউন্টিং অফিস-এর একটি তদন্তে দেখা যায়, ২৮ জন ফেডারেল কর্মকর্তা চাকরিতে ঢোকার সময় যেসব ডিগ্রির কথা উল্লেখ করেছিলেন, তারা তা সত্যিকার অর্থে অর্জনই করেননি। এ ধরনের বিষয় উল্লেখ করে মোহলার নামক একজন গবেষক তার বিখ্যাত একটি বই-এ একটি অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন: ওয়েলকাম টু দি এজ অব ডিজঅনেস্টি। আর আমরা তো জানি, ডিজঅনেস্টি হয় সত্যের অভাবে। বাংলাদেশের বহু প্রতিষ্ঠানে এরূপ ভুয়া ডিগ্রিধারী কর্মী পাওয়া যাবে। তা দেখার জন্য, অনুসন্ধানের জন্য সত্যনিষ্ঠ কেউ আছেন কি?
সত্যবাদিতা একজন মানুষের চরিত্র গড়ে তোলে। যার চরিত্র ভালো তাকে সবাই ভালোবাসে। সেজন্যই আমাদের সব সময় সত্য বলার অভ্যাস করা জরুরি। সবাই মিথ্যাবাদী হলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম মিথ্যার সাগরে ভাসতে ভাসতে একদিন ধ্বংসের অতলান্তে তলিয়ে যাবে। সত্য বলতে হবে। সত্য বলার জন্য উত্সাহ দিতে হবে। বুঝতে হবে, সত্যবাদীরা সাহসী হয়, কথা রক্ষা করে, আমানতের খেয়ানত করে না, অন্যকে কষ্ট দেয় না, কাউকে ভয় করে না। সত্য মানুষের মনকে হীনম্মন্যতা থেকে রক্ষা করে। সত্যের চর্চাকারীর মনে জোর থাকে। মানুষ তার উপর নির্ভর করে, তাকে বিশ্বাস করে, তার উপর দায়িত্ব দিতে দ্বিধাবোধ করে না। সবশেষে বলি, বাংলাদেশের দামাল তরুণ-তরুণীরা, আবাল বৃদ্ধ বনিতারা জেগে ওঠো। সত্য প্রতিষ্ঠায় একাট্টা হও।
n লেখক : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
