ঢাবির দুই ছাত্রনেতার খোঁজ নেই দীর্ঘদিন

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:৩১

শাহ আলম ও দেলোয়ার হোসেন। প্রথমজন ছাত্রদল নেতা, অপরজন ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ দুই ছাত্র দীর্ঘদিন ধরেই নিখোঁজ। শাহ আলম ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল শাখার সাধারণ সম্পাদক থাকাবস্থায় নিখোঁজ হন। দেলোয়ার নিখোঁজ হন ২০১২ সালে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অবস্থায়। দুই ঘটনায়ই থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। কিন্তু দেলোয়ার নিখোঁজের তিন বছর এবং শাহ আলম নিখোঁজের ১১ বছর কেটে গেলেও কোন মামলা দায়ের করা হয়নি। এমনকি এ দুইজনকে খুঁজে বের করতে পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা তাদের দুই দলের কারোই উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ প্রকাশ পায়নি। দুই নেতার ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, দলের ভিতরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণেই শাহ আলম ও দেলোয়ার নিখোঁজ হয়েছেন। রাজনৈতিক চাপ না থাকায় পুলিশ দুই জনের কাউকেই খুঁজে বের করতে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশকে অনুরোধ এবং পরিবারকে অবহিত করে দায়িত্ব সেরেছে। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের কাছে অভিযোগ-অনুরোধ জানিয়ে আশাহত হয়ে পড়েছেন শাহ আলম ও দেলোয়ারের পরিবার। ভিন্ন দুই দলের নেতা হলেও একই পরিণতি বহন করতে হয়েছে এ দুই ছাত্রনেতাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও প্রক্টর অফিস এবং ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে শাহ আলম গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। তখন ছাত্রদলের জহুরুল হক হলের সাধারণ সম্পাদক থাকাবস্থায় তিনি নিখোঁজ হন। তার সাথে সে সময়ের ছাত্রদলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার হল শাখার সভাপতি তানজিলের বিরোধ চলছিল। অন্যদিকে ২০১২ সালে নিখোঁজ হওয়ার সময় দেলোয়ার আরবি সাহিত্যের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রলীগের মুহসীন হল শাখার সাবেক এ সাংগঠনিক সম্পাদক ২০১১ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সংগঠনের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে সভাপতি পদপ্রার্থী ছিলেন। তার সাথেও সংগঠনটির তখনকার শীর্ষ এক নেতা ও সাবেক এক নেতার দ্বন্দ্ব চলছিল।
শাহ আলম নিখোঁজের ১১ বছর
শাহ আলম নিখোঁজ হওয়ার পর ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট রমনা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তার ভাই গোলাম রব্বানী। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে ঈদের আগের দিন সর্বশেষ তার সঙ্গে শাহ আলমের কথা হয়। শাহ আলম ফোনে তার ভাইকে জানান যে তিনি বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পর থেকেই তার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ঢাকায় তার বন্ধু-বান্ধব, স্বজন ও পরিচিতদের কাছে খোঁজ নিয়েও কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে তখনকার হল শাখার সভাপতির সাথে তার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও হুমকির তথ্য পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরেই হল শাখার এ দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে বিরোধ চলছিল।
শাহ আলমের বড় ভাই গোলাম রব্বানী বলেন, শাহ আলমের খোঁজ জানার জন্য ছাত্রদল, বিএনপি, পুলিশের অনেকের কাছে গিয়েছি, কিন্তু কেউই ছোট ভাইয়ের খোঁজ দিতে পারেননি। ভাইকে মেরে ফেলা হলেও অন্তত লাশটা পেলে কবর দিতে পারতাম। এখন আর কোনো আশা করি না। তিনি জানান, চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে শাহ আলম ছিলেন সবার ছোট। মা আগেই মারা গিয়েছিলেন। শাহ আলম নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাবা অসুস্থ হয়ে তিন বছর পর মারা যান।
ছাত্রদলের জহুরুল হক হল শাখার তখনকার এক নেতা ও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা জানান, ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে ঈদের আগের দিন তানজিলের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল শাহ আলমকে। তানজিল তখন ছাত্রদলের শীর্ষ নেতার এবং শাহ আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতার অনুসারী ছিলেন। শাহ আলম নিখোঁজের পরের বছর ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর শাহ আলম গ্রুপের আরেক নেতা ও তার ঘনিষ্ঠ মাহাবুবুল ইসলাম খোকনকে পিটিয়ে হত্যা করেন তানজিলের গ্রুপের নেতা-কর্মীরা। ছাত্রদলের একাধিক নেতার ধারণা, শাহ আলমকেও খুন করে লাশ গুম করা হয়েছে। এ ঘটনায় দলের অনেক বড় নেতার রাজনীতি জড়িত বলে দলের পক্ষ থেকে কোন খোঁজ নেয়া হয়নি, বরং ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। পুলিশ জানায়, মতিঝিলে এক ডাকাতির ঘটনার পর থেকে তানজিল পলাতক রয়েছেন।
দেলোয়ার নিখোঁজের তিন বছর
২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে দেলোয়ার তার বোন বিলকিস বেগমের লালবাগের বাসায় গিয়েছিলেন। ঐ বাসা থেকে বের হওয়ার পর দেলোয়ারকে তার স্বজনরা আর দেখেননি। ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল পাঁচটার দিকে দেলোয়ারের মোবাইল নম্বর থেকে একজন তার বোন বিলকিসের নম্বরে ফোন করে বলেন, দেলোয়ারের মোবাইলটি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কুড়িয়ে পেয়েছেন। তারপর ঐ ব্যক্তিও ফোন বন্ধ করে দেন। এরপর বিলকিস ২৩ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ঐ জিডিতে ছাত্রলীগের সাবেক এক কেন্দ্রীয় সভাপতির সাথে দেলোয়ারের তীব্র মতবিরোধ চলছিল বলে উল্লেখ করা হয়। দেলোয়ারের নিখোঁজের সাথে ঐ নেতার সম্পর্ক রয়েছে বলে সন্দেহ করেন ছাত্রলীগের একাধিক নেতা। এক্ষেত্রে ‘বৃহত্তর রাজনীতি’ রয়েছে বলে দলের পক্ষে দেলোয়ারের কোন খোঁজ নেয়া হয়নি।
দেলোয়ারের বড় ভাই ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক হাসিবুর রহমান মানিক বলেন, দেলোয়ার নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয়, দলীয় নেতাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কোন ফল পাইনি। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন তিনি।
 
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. আমজাদ আলী বলেন, দুই ঘটনায়ই পরিবারের পক্ষে থানায় জিডি করা হয়েছে। পরিবার আমাদের সাথে তেমন যোগাযোগ করেনি। এ ঘটনাগুলোতে আমাদের খুব বেশি কিছু করার থাকে না। পুলিশকে তদন্ত করতে অনুরোধ করা হয়েছিল। পরে ‘সেভাবে আর খোঁজ’ নেয়া হয়নি।

রমনা ও লালবাগ থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা পৃথকভাবে জানান, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে’ মার এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই দুই নেতা নিখোঁজ হয়েছেন। তাদেরকে খুন করেও লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে। বিভিন্ন উপায়ে খোঁজ নিয়েও পুলিশ তাদের সন্ধান পায়নি। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর তাদেরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।