পাকিস্তানের সীমানায় ঢুকে জঙ্গি আস্তানায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ভারত। এই হামলাকে বেসামরিক এবং আগাম সতর্কতামূলক দাবি করে ভারত বলেছে, কাশ্মিরের পুলওয়ামায় হামলা চালানো জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদের তিনশোর বেশি জঙ্গি বিমান হামলায় নিহত হয়েছে। তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে হতাহতের বিষয়টি নাকচ করা হয়েছে। তারা বলেছে, পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর পাল্টা ধাওয়ায় পালিয়ে গেছে ভারতের যুদ্ধবিমান। ভারত আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। পাকিস্তানেরও আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে, যথা সময়ে সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারত-শাসিত কাশ্মিরের পুলওয়ামায় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বহরে হামলায় ৪০ জনের বেশি সিআরপিএফ সদস্য নিহত হয়। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদ এই হামলার দায় স্বীকার করে। এরপরই পাকিস্তানকে কড়া জবাব দেওয়ার দাবি ওঠে ভারতের নানা মহল থেকে। ধারণা করা হচ্ছিল, ভারত দ্রুত পাল্টা জবাব দেবে। এরই প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার পাকিস্তানে ঢুকে বিমান হামলা চালিয়েছে ভারতের বিমান বাহিনী। ১৯৭১ সালের পর পাকিস্তানে ভারতীয় বিমান বাহিনীর এটাই প্রথম হামলা।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বালাকোটে জইশ-ই-মহম্মদের জঙ্গি ঘাঁটিতে বিমান থেকে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। ১২টি মিরেজ ২০০০ যুদ্ধবিমান কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে বালাকোটে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শিবিরে ১০০০ কেজি বোমা নিক্ষেপ করে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত বালাকোটের ক্যাম্পে সব মিলিয়ে ছয়বার হামলা চালায় ভারতীয় বাহিনী। গোটা অপারেশন শেষ হয়েছে দেড় মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে। এই হামলায় জইশ-ই-মোহাম্মদ এর প্রধান মাসুদ আজহারের শ্যালক মওলানা ইউসুফ আজহার নিহত হয়েছেন। শিবিরটি পরিচালনা করতেন ইউসুফ আজহার, যিনি ‘ওস্তাদ ঘাউড়ি’ নামেও পরিচিত।
ভারতের দাবি
পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয়। তিনি বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বালাকোটের ওই শিবিরটি ছিল জইশ-ই-মোহাম্মদের সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ শিবির। বিমান হামলায় বিপুল সংখ্যক জইশ-ই-মোহাম্মদের জঙ্গি সদস্য, প্রশিক্ষক ও কমান্ডার নিহত হয়েছে। জইশ-ই-মোহাম্মদ ভারতের অভ্যন্তরে আত্মঘাতী হামলাসহ জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য ছিল। এ কারণে এই বিমান হামলা চালানো জরুরি ছিল। তিনি বলেন, এটি বে-সামরিক আগাম সতর্কতামূলক হামলা। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল না। আর সেখানে কোনও সাধারণ নাগরিকের বসতিও নেই। তাই তাদের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না।
তিনি বলেন, পুলওয়ামার হামলার আগেও দুই বার জইশ-ই-মোহাম্মদ ভারতে হামলা চালিয়েছে। একবার ভারতের সংসদ ভবনে ও আরেকবার পাঠানকোটের সেনা ছাউনিতে। পাকিস্তানকে বারবার জইশ-ই-মোহাম্মদের শিবিরগুলোর অবস্থান জানানো হয়েছে, কিন্তু তারা কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি। তাই সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতেই আগেভাগে বোমা হামলা করে জঙ্গি শিবির ধ্বংস করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছিলো, নিয়ন্ত্রণ রেখার অন্যদিকে পাকিস্তান শাসিত কাশ্মিরের বালাকোটে হামলা চালিয়েছে ভারত। কিন্তু ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র নিশ্চিত করেছে, যে বালাকোটে বিমান হামলা হয়েছে, সেটি খাইবার-পাখতুনখোয়ার বালাকোট।
এদিকে বিমান হামলার পর ভারতজুড়ে উত্সবে মেতেছে জনতা। মঙ্গলবার লোকজন সড়কে নেমে আনন্দ মিছিল করেছে, কোথাও কোথাও মিষ্টিও বিতরণ করা হয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থকরা বাজি পুড়িয়ে উল্লাস করেছে।
পাকিস্তানের দাবি
ভারতের বিমান হামলায় হতাহতের কথা অস্বীকার করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বলছেন যে, মুজাফফরাবাদ সেক্টর দিয়ে ভারতীয় বিমান আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। কিন্তু বিমানগুলো তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। তারা (ভারত) কোন বোম্বিং করতে পারেনি। সীমানা লঙ্ঘনের পরপরই পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান ভারতীয় বিমানকে ধাওয়া করে। ভারতের হামলার দাবির পরপরই পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ দফতরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আসিফ গফুর বলেন, তাদের বিমানবাহিনী সঙ্গে সঙ্গেই তাড়া করে ভারতীয় বিমানগুলোকে। ভারতীয় বিমান থেকে যে বোমা ফেলা হয়েছিল, তা বালাকোটের কাছে পড়েছে। ভারতীয় বিমান থেকে ফেলা বোমার টুকরোর একটি ছবিও টুইটারে শেয়ার করেন তিনি।
গতকাল বিকালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে আইএসপিআর মহাপরিচালক আসিফ বলেন, আমাদের জবাবের জন্য এখন ভারতের অপেক্ষা করার সময় এসেছে। তারা আমাদের বিস্মিত করতে পারেনি। আমরা প্রস্তুত আছি এবং জবাব দিয়েছি। আমরা ভারতকে বিস্মিত করবো। সেজন্য অপেক্ষা করুন। আমাদের জবাব ভিন্ন হবে।
তিনি বলেন, ভারত দাবি করেছে যে তাদের বিমান ২১ মিনিট পাকিস্তানের আকাশ সীমায় ছিল। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, আসুন আর ২১ মিনিট আমাদের সীমানায় থাকুন। তিনি বলেন, ভারত কোনো সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়নি, সেটা হলে আমাদের সেনারা প্রস্তুত ছিল।
হতাহতের বিষয়ে ভারতের দাবি নিয়ে তিনি বলেন, সেখানে একটি ইটও নেই অথচ ভারত দাবি করছে সাড়ে তিনশো জনকে হত্যা করা হয়েছে। সেখানে যদি ১০ জনও মারা যায়, তবে তাদের মরদেহ কোথায়, রক্ত কোথায়। বালাকোটের ওই জায়গা উন্মুক্ত রয়েছে। এমনকি ভারতীয়রাও আসতে পারেন। দেখে গিয়ে সেখানকার অবস্থা আপনাদের প্রধানমন্ত্রীকে বলুন। তিনি জানান, আজ বুধবার পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যৌথ অধিবেশন হবে। প্রধানমন্ত্রী ন্যাশনাল কমান্ড অথোরিটির বৈঠক ডেকেছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মোহাম্মদ কোরেশি বলেছেন, পাকিস্তান এই ঘটনার উপযুক্ত জবাব দেবে।
দেশ সুরক্ষিত হাতে রয়েছে:মোদী
ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমা হামলার পর রাজস্থানের চরুতে এক জনসভায় প্রতিক্রিয়া জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভারতীয়দের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, দেশ সুরক্ষিত হাতে আছে। আমি এই মাটিকে সাক্ষী রেখে বলছি, দেশের মাথা নিচু হতে দেব না।
সূত্র জানায়, পুরো অপারেশনে নজর রাখেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।
বিমান বাহিনীর হামলার পর প্রধানমন্ত্রী মোদীর বাসভবনে জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ছিলেন সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারমন, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। এছাড়া নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন ওই বৈঠকে। এছাড়া দেশের তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন মোদী।
যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকুন:ইমরান
ভারতীয় বিমান বাহিনীর হামলার পর সমস্ত পরিস্থিতির জন্য পাকিস্তানের সেনা ও জনগণকে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে ভারতের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন নীতি উন্মোচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হামলার পর গতকাল জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ইমরান। বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ভারত অকারণে আগ্রাসন দেখিয়েছে। পাকিস্তান নিজের সময় মতো এর জবাব দেবে। পাকিস্তানের এই বৈঠকে হাজির ছিলেন, তিন বাহিনীর প্রধান এবং অন্যরা।
নিয়ন্ত্রণ রেখায় আবারো গোলাগুলি
ভারতীয় বিমান হামলার পর কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ রেখায় ফের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে পাকিস্তান গুলি চালিয়েছে বলে দাবি করেছে ভারত। তবে হতাহতের কোনও খবর পাওয়া যায়নি। আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল থেকে জম্মু-কাশ্মিরে নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন আখনুর, নওশেরা এবং কৃষ্ণঘাঁটি সেক্টরে লাগাতার গোলাগুলি বর্ষণ করে পাকিস্তানি সেনারা। তাদের পাল্টা জবাব দিয়েছে ভারতীয় সেনারাও। এর আগে, সোমবারই পুঞ্চ, মেন্ধার এবং নওশেরায় সেনার পোস্ট লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করে পাকিস্তান।
দুই দেশকেই নিয়ন্ত্রিত আচরণের আহ্বান বিশ্ব সম্প্রদায়ের
পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জঙ্গি আস্তানায় ভারতের বিমান হামলার পর দুই দেশকেই নিয়ন্ত্রিত আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়। পাকিস্তান এবং ভারত নিজেদের মধ্যে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেছে চীন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউ সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর জন্য দুই দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ইইউ’র মুখপাত্র মাজা কোচিজানসিচ বলেন, দুই দেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। উত্তেজনা এড়াতে দুই দেশেরই সর্বোচ্চ সংযম প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়া দুই দেশকে নিয়ন্ত্রিত ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে। এর আগে গতকাল দিনের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক এবং ছয়টি আসিয়ান দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে।
