দৈনিক ইত্তেফাক-এর ৬২ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে লন্ডনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলে পূর্ব লন্ডনের মন্টিফিউরি সেন্টারে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বলেন, দৈনিক ইত্তেফাক ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ ব্যক্তি মালিকানার ঊর্ধ্বে আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপরিচিতি লাভ করেছে।
কমিউনিটি নেতা ও টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক কাউন্সিলর হেলাল রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, আমি গর্বিত যে সাংবাদিকতা জগতের ধন্য পুরুষ তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার হাতে সাংবাদিকতা শিখেছি। ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের আগে ইত্তেফাক দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। ইত্তেফাক তখন ৪ পৃষ্ঠার কাগজ ছিল। আর দৈনিক আজাদ ছিল ৮ পৃষ্ঠা। সেই সময়ে আজাদের সঙ্গে প্রতিযোগীতায় ইত্তেফাকের টিকে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু মানিক মিয়া ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’ শিরোনামে একটি কলাম লিখতেন। তিনি সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে লিখতেন। ফলে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইত্তেফাক। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, তখন আমরা লিখতাম- ‘দ্রব্যমূল্য বাড়িয়া গিয়াছে। সবকিছু ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলিয়া গিয়াছে।’ আর মানিক মিয়া শুরু করলেন- ‘গতকাল বাজারে গিয়াছিলাম ছাগলের দামে একটি মুরগি কিনিয়া আনিয়াছি।’ এজন্য বলা হয় মানিক মিয়া বাবু-ভাষার বিপরিতে সাংবাদিকতার সহজ ভাষাও সৃষ্টি করেছেন। পাকিস্তান সরকার তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। তিনি জেল খেটেছেন। তবু মাথা নত করেননি। তিনি এক কথার সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করতেন। তিনি তার পত্রিকার সাংবাদিক কিংবা লেখকদের জন্য ঝুঁকি নিয়েছিলেন। এজন্য নিজে নির্যাতনও সহ্য করেছেন। তার শত উদাহরণ রয়েছে। তার মেধা-মনন-প্রজ্ঞা এবং অদম্য সাহসের ফলে তারই প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ইত্তেফাক গোটা জাতীর কাছে প্রিয় হয়েছিল। আজও তা গর্বের।
এই বর্ষিয়ান সাংবাদিক বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আজ কালো টাকার কাছে জিম্মি। হালে বেড়ে ওঠা বড় পত্রিকা হাউজগুলোর মালিক কারা তা আপনারা জানেন। তাদের টাকার উৎস কারো অজানা নয়। কিন্তু দৈনিক ইত্তেফাকের মালিকদের আজো কোন কালো ব্যবসা গড়ে ওঠেনি। তাও দেশের মানুষ জানে। তিনি আরো বলেন দৈনিক ইত্তেফাক শুরু থেকেই সাংবাদিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে যত্নশীল ছিল। কখনোই ত্রুটি করেনি। বরং অন্যাদের তুলনায় ইত্তেফাকের সাংবাদিক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা বেশি পাওয়ার সুনাম রয়েছে। জনপ্রিয়তার পিছনে এটাও একটি কারণ।
তিনি আরো বলেন, দৈনিক ইত্তেফাক বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অস্তিত্ব, অগ্রগতি-উন্নয়ন কিংবা জাতীয় ক্রান্তিকালের ইতিহাস সবকিছুতেই জড়িয়ে আছে।
বিশেষ অতিথি লন্ডন অ্যাসেমবøী মেম্বার মি. জন বিগস বলেন, জাতি গঠনে একটি আদর্শ সংবাদপত্রের যতটুকু ভূমিকা থাকা প্রয়োজন দৈনিক ইত্তেফাক সেই দায়িত্ব পালনে সার্থক হয়েছে। তা না হলে একটি সংবাদপত্র ৬২ বছর টিকে থাকতে পারে না। তিনি আরো বলেন বৃটেনের সংবাদপত্রগুলো শতযুগ ধরে টিকে আছে তাদের সঠিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। আমি বিশ্বাস করি ইত্তেফাক দায়িত্বশীলতার মাঝে টিকে আছে।
সভাপতির বক্তব্যে হেলাল রহমান বলেন, ইত্তেফাক আমাদের জাতীয় গৌরব। জাতীয় ঐতিহ্য। বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতার কণ্ঠস্বর। এক সময়ে কারো হাতে ইত্তেফাক দেখলে মানুষ অনায়াসে তাকে ভদ্র ও প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ মনে করতো। উচ্চ শিক্ষিত মানুষের পরিচয় ছিল ইত্তেফাক। গাড়িতে-ট্রেনে এই পত্রিকাটি কাউকে পড়তে দেখলে মানুষ তাকে সম্মান করতো। আমি আসা করি বর্তমান কর্ণধররা সেই অবস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হবেন।
আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য বাখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক শামীম রেজা, সিনিয়র শিক্ষক মাসুদ রানা, চ্যানেল আই ইউকে-ইউরোপের প্রধান নির্বাহী রেজা আহম্মদ ফয়সল চৌধুরী, লন্ডনস্থ এনটিভির হেড অব দ্যা নিউজ বুলবুল হাসান, টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির কমিউনিটি অ্যাডভাইজার ও সাপ্তাহিক সুরমা'র সাবেক সম্পাদক সৈয়দ মনসুর উদ্দিন, সাপ্তাহিক জনমতের বার্তা সম্পাদক মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও এনআরবি ব্যাংকের অন্যতম পরিচালক রফিক হায়দার প্রমুখ।
এদিকে ইত্তেফাকের ৬২ বছরের অগ্রযাত্রায় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত বৃটিশ এমপি রোশনারা আলী ও টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক কাউন্সিলর জেনিথ রহমান প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বিবিসি বাংলার সিনিয়র সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসাইন, মূলধারার প্রভাবশালি ইংলিশ পত্রিকা মেইল অন সানডের রিপোর্টার আবু তাহের, প্রবাসী লেখক অলি রহমান, বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা এম আজিজ চৌধুরীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন লন্ডন বেতার বাংলার প্রযোজক ও অনুষ্ঠান উপস্থাপক ড. আনিসুর রহমান আনিস।
উপস্থিত অতিথিবৃন্দকে ইত্তেফাক পরিবারের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানান ইত্তেফাকের লন্ডন প্রতিনিধি অহিদুজ্জামান।
তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজু আহমেদ ইত্তেফাকের সৌজন্যে আগত অতিথিদের আপ্যয়নের ব্যবস্থা করেন।
