‘দয়া করে আমাদের আর পোড়াবেন না। আমরা নিরীহ দিনমজুর, পেটের দায়ে রাস্তায় যেতে হয়। পেট্রোলের পোড়া সে কিযে যন্ত্রণা, তা আপনারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বিলাসবহুল জীবন-যাপনের মধ্যে থেকে বুঝতে পারবেন না। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আন্দোলনের কর্মসূচি দিন। এ নিয়ে আমাদের নিরীহ দিনমজুরদের কোন দ্বিমত নেই। তবে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার নির্মম সংস্কৃতি বন্ধ করুন।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন অবরোধে বোমা হামলায় অগ্নিদগ্ধরা এ আকুতি জানিয়েছেন। গতকাল শনিবার ছিল বিএনপির ডাকা অবরোধের ১২তম দিন। এই ১২ দিনে সারাদেশে দুর্বৃত্তদের বোমা হামলায় অর্ধশতাধিক যাত্রী, পুলিশ, চালক ও হেলপার দগ্ধ হন। এর মধ্যে মারা যান ৮ জন। বর্তমানে বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন রয়েছেন ১৬ জন।
সরেজমিনে গতকাল বার্ন ইউনিটে গেলে এই প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ ও কষ্টের কথা বলেন দগ্ধ ব্যক্তিরা। যাদের বেশিরভাগই খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। এসময় তারা বিরোধী দলের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশে সরকারের বিরুদ্ধে কি ধরনের আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হয়, দয়া করে তা অনুসরণ করুন। নইলে আমাদের যারা পুড়িয়ে মারছে আমরা তাদেরকে একই কায়দায় পুড়িয়ে মারবো।’ একই ধরনের প্রতিক্রয়া ব্যক্ত করেন রোগীদের স্বজনরা।
বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা ডা. সামন্ত লাল সেন এবং বিভাগীয় প্রধান প্লাস্টিক সার্জন অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম বলেন, পোড়া রোগীদের কষ্ট ও যন্ত্রণা সেই শুধু বুঝে যে আগুনে পোড়ে। এর মধ্যে পেট্রোলের আগুনে দগ্ধদের যন্ত্রণা সবচেয়ে বেশি। পোড়া রোগী সুস্থ হলেও তারা স্বাভাবিক জীবন পান না। বিকলাঙ্গ হওয়াসহ নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। তবে পোড়া রোগীদের (যারা সুস্থ) ৯৮ ভাগই প্লাস্টিক সার্জারি করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন। অবশ্য এ চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই দুই শীর্ষ চিকিত্সক সহিংসতার হাত থেকে নিরীহ ও অসহায় দিনমজুরদের রক্ষা করতে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জ্বালাও পোড়াও সংস্কৃতি বন্ধ করার আহ্বান জানান।
ইউনিটের জুনিয়র চিকিত্সকেরাও একই মতামত পোষণ করে বলেন, পোড়া রোগীদের চিকিত্সা কালে তাদের যন্ত্রণা দেখে আমরাও কান্না ধরে রাখতে পারি না। ৩শ বেডের বার্ন ইউনিটে প্রতিদিন চিকিত্সাধীন থাকে ৫ শতাধিক রোগী। জরুরি ও বার্ন বিভাগে প্রতিদিন আসে ২ শতাধিক পোড়া রোগী। মাত্র ৬৩ জন চিকিত্সক দিয়ে এতো বিশাল সংখ্যক পোড়া রোগীর চিকিত্সা ও নিয়মিত অপারেশন সামাল দেয়া কষ্টকর। চাহিদা অনুযায়ী বিছানা না থাকায় বারান্দা, করিডোরে যত্রতত্র বিছানা পেতে পোড়া রোগীদের চিকিত্সা দিতে হচ্ছে।
বার্ন ইউনিটে বর্তমানে চিকিত্সাধীন রয়েছেন, ৫ জানুয়ারি ময়মনসিংহ শহরে পেট্রোলের আগুনে দগ্ধ ইজিবাইক চালক সিদ্দিকুর রহমান (৪০), ৯ জানুয়ারি তেজগাঁও মহিলা কলেজের সামনে পেট্রোল বোমায় দগ্ধ রিকশাচালক আমূল্য চন্দ্র বর্মন (৪৫), ১০ জানুয়ারি রাতে নারায়ণগঞ্জ আমলাপাড়ায় বন্ধন পরিবহনের বাসে পেট্রোল বোমায় অগ্নিদগ্ধ যাত্রী এনজিও কর্মকর্তা আল মাসুদ (৫৫), ১১ জানুয়ারি রাতে দক্ষিণ কমলাপুরে পেট্রোল বোমায় দগ্ধ লেগুনা চালক সেলিম (৩০), ১১ জানুয়ারি রাতে মুন্সিগঞ্জ মুক্তারপুর এলাকায় পেট্রোলের আগুনে দগ্ধ সিএনজি অটোরিশা চালক সাইফুল (৪৫), ১৩ জানুয়ারি রাতে বগুড়ায় ঢাকাগামী বাসে অগ্নিসংযোগে দগ্ধ যাত্রী স্বপ্না (২৮), নরসিংদী মাধবী এলাকায় গত বুধবার রাতে বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়ায় দগ্ধ হেলপার মাসুম (১৫), একই রাতে রংপুর মিঠাপুকুরে বাসে পেট্রোল বোমায় দগ্ধ মিনারা বেগম (২৬) ও গত বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জ মোড়ে পেট্রোল বোমায় দগ্ধ ট্রাক চালক সিদ্দিক (৪০)।
রোগীরা জানান, পেট্রোলের আগুনে তাদের সুখের সংসার পুড়ে গেছে। পরিবারের সদস্যদের এখন কি হবে? তারা কিভাবে বাঁচবে? এই ভেবে যন্ত্রণার মাঝেই তারা বিলাপ করে কেঁদে উঠেন। তারা হামলাকারী দুর্বৃত্তদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে বলেন, নিরীহ অসহায় মানুষকে মেরে ক্ষমতায় যেতে চাইলে তারাই পুড়ে মারা যাবে। আল্লাহর কাছে আমরা এ ফরিয়াদ জানাই। বিশেষ করে যারা পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে তারা যেন একইভাবে পুড়ে মরে। তখন বুঝবে পোড়ার যন্ত্রণা কত?