নিভে গেল প্রেরণার বাতি

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৫, ০১:২৮

‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’সহ মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণাদায়ী বহু গানের স ষ্টা তিনি। তার লেখা গান রক্তে আগুন ধরিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় পাশে ছিলেন বাংলাদেশের শরণার্থীদের। মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণার বাতি জ্বালানো গীতিকার গোবিন্দ হালদারের জীবন বাতি নিভে গেল। গতকাল শনিবার কলকাতায় জিতেন্দ্র নারায়ণ রায় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। গোবিন্দ হালদারের মৃত্যুতে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে।

পরিবার ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গোবিন্দ হালদার দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরেই হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। গত ২২ ডিসেম্বর কলকাতা সফরে গিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ হাসপাতালে তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন। গোবিন্দ হালদারের চিকিত্সার দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চিকিত্সায় কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যান। স্বাস্থ্যের অবনতি হলে গত ১০ জানুয়ারি ফের হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিত্সকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২০ মিনিটে মারা যান তিনি। সন্ধ্যায় কলকাতার নিমতলা শ্মশানঘাটে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গিয়েছেন স্ত্রী পারুল হালদার, মেয়ে গোপা দত্ত এবং জামাতা চিন্ময় দত্তকে।
এদিকে গোবিন্দ হালদারের মৃত্যুতে বাংলাদেশ থেকে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তি ও সংগঠন। গতকাল দুপুরে প্রয়াতের পরিবারের কাছে শোক জানিয়ে ফুল পাঠিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সি পি এম’র পক্ষে হাসপাতালে যান সাবেক সংসদ সদস্য সুজন চক্রবর্তী। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হয়ে গোবিন্দ হালদার বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের আলোড়িত করেছিলেন। আমরা তাঁকে যোগ্য সম্মান জানাতে পারিনি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে হাসপাতালে গিয়ে শোকবার্তা জানান কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রদূত জকি আহাদ।
১৯৩১ সালে অবিভক্ত যশোর জেলার বনগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গোবিন্দ হালদার। তিনি চাকরি করতেন ভারত সরকারের আয়কর বিভাগে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের দেখে তিনি আলোড়িত হন। ‘পূর্ব দিগন্তে, সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল, রক্ত লাল’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যাঁরা’, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’সহ বেশ কিছু গান লিখে বনগ্রাম থেকে চলে যান কলকাতার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। যোগাযোগ হয় কামাল লোহানীর সঙ্গে। আপেল মাহমুদের কণ্ঠে তাঁর গানে  উজ্জীবিত হন মুক্তিযোদ্ধারা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
গতকাল শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেন, গোবিন্দ হালদারের দেশাত্মবোধক গান ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে লাখ লাখ বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার মৃত্যুতে জাতি একজন প্রকৃত বন্ধুকে হারালো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তার মৃত্যুতে দেশের মানুষ একজন অকৃত্রিম বন্ধুকে হারালো। বাংলাদেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে তার মূল্যবান অবদানের কথা সবসময় স্মরণ করবে।

এছাড়া শোক জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজসহ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক জোট, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ প্রভৃতি সংগঠন।