তীব্র শীতে আরো ৯ জনের মৃত্যু

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:০২

সারাদেশে শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত আছে। শীতের কারণে সারা দেশ থেকে আরো ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত দুই শতাধিক শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ইত্তেফাক সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

চলনবিল (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, চলনবিলের মাঘের হাড় কাঁপানো শীত শুরু হয়েছে। পৌষের শীতে মানুষকে কাবু করতে না পারলেও গত ৩ দিনের শীতজনিত রোগে তাড়াশ উপজেলাতেই মারাগেছে ৫ জন বয়স্ক মানুষ। তাপমাত্রা ক্রমশ: হ্রাস পাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা তাড়াশে রেকর্ড করা হয় ১০ ডিগ্রী এবং সর্বোচ্চ ১৪ ডিগ্রী। এর আগের দিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ এবং তার আগের দিন ছিল ১২ ডিগ্রী। ক্রমশ: তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ায় শীতের ধকল সহ্য করতে হচ্ছে। ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, কোল্ড ডাইরিয়া, আমাশয়, সর্দি-কাশিসহ রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে বহু মানুষ।
জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, মৃদু শৈত্য প্রবাহের কবলে পড়ে গতকাল মঙ্গলবার এ উপজেলায় আরো ২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এরা হচ্ছে উপজেলার মোক্তারপুর গ্রামের হুরজান বেগম (৭১) ও দৌলত্গঞ্জপাড়ার আলাউদ্দিন (৭৫)। তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে এরা কোল্ড স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় বলে তাদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।  চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিস গতকাল এ জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড করেছে ৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আদ্রতার পরিমাণ ছিলো ৯৭ শতাংশ।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, উত্তর থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া অব্যাহত থাকায় গত তিন দিন থেকে গাইবান্ধা জেলার সর্বত্র কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মত ঝরেছে কুয়াশা। তিনদিন থেকেই সূর্যের দেখা মিলছে না। জেলা ও উপজেলা সদর বিকালেই জনশূন্য হয়ে পড়ছে। গাইবান্ধা আধুনিক হাসপাতালের বহির্বিভাগে শীত জনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ২৯ জন শিশু চিকিত্সাধীন রয়েছে। এছাড়া গত এক সপ্তাহে ২ জন শিশু শীতজনিত রোগে মারা গেছে। গাইবান্ধার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. এসএমএ জলিল বলেন, জেলার সাত উপজেলার হাসপাতালগুলোতে গত দু’দিনে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত শিশু ও বৃদ্ধ রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মাগুরা প্রতিনিধি জানান, মাগুরায় প্রচণ্ড শীতে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গত এক সপ্তাহে  দুইশতাধিক শিশু ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ৭০টি শিশুকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের বয়স ৩ মাস থেকে ৬ বছর। মাগুরা সদর আধুনিক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে মাত্র ১০টি বেড রয়েছে সেখানে  গতকাল  মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ভর্তি রয়েছে ৭০ জন শিশু। বেডের অভাবে অনেক শিশু রোগীকে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। অন্যরা বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিত্সা নিচ্ছে। শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাগুরা সদর হাসাতালের শিশু বিভাগের চিকিত্স ডা: জয়ন্ত কুমার কণ্ডু জানান, হাসপাতালে  শিশু ওয়ার্ডে বেড রয়েছে মাত্র ১০টি। সেখানে শিশু রোগীর সংখ্যা ৭০।
শীতের কারণে মানুষ রাতে ঘর থেকে বের হতে পারছে  না। শীতের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায়  সাধারণ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শীত থেকে বাঁচবার জন্য পুরাতন কাপড়ের দোকানে ক্রেতাদের প্রচুর ভীড় দেখা যাচ্ছে। 
শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, মাঘের হাড় কাঁপানো শীত আর প্রচণ্ড শৈত্য প্রবাহে শিবচরে মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রবিবার থেকে শুরু হওয়া টানা শৈত্য প্রবাহে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তীব্র শীতে অতিদরিদ্ররা মানবেতর জীবনযাপন করছে। টানা শৈত্য প্রবাহে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে শিশু ও বৃদ্ধরা। এরা অনেকে ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, কোল্ড এলার্জিসহ বিভিন্ন জটিল রোগে শিশু ও বৃদ্ধরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ঘন কুয়াশার মধ্যে  রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন।
গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, গত দুদিন ধরে হাড় কাঁপানো হিমেল হাওয়া ও শৈত্যপ্রবাহে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তার চরাঞ্চল ও তিস্তা তীরবর্তী গ্রামসহ উপজেলার সর্বত্র নিম্ন আয়ের মানুষের চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। গতকাল সারাদিন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। সকালে রাস্তাগুলোতে হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহনগুলোকে চলতে দেখা গেছে। এদিকে শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে পুরানো কাপড়ের দোকানগুলোতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। দামও বেশি নিচ্ছে দোকানদাররা। শীতের কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছে। লোকজন খড়-কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবও বেড়েছে। মানুষের পাশাপাশি শীতের কবলে পড়েছে গবাদিপশু।
সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে গত ১২ দিনের টানা প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশায় জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। ১২ দিন যাবত্ সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। কনকনে শীত ও হিমেল হাওয়ার ফলে চরাঞ্চলের ৩টি ইউনিয়ন দিয়ারা নারিকেল বাড়িয়া, চর নাছিরপুর ও চর মানাইর ইউনিয়নের অভাবী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে সরকারিভাবে কিছু শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণ করা হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। অভাবী ও দিনমজুররা কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। অপরদিকে শিশুরা জ্বর, ঠাণ্ডাকাশি, নিউমোনিয়া, আমাশয়, ডায়রিয়া ও পেটেরপীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভিড় জমাচ্ছে।
ফুলবাড়ি (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, কুয়াশাচ্ছন্ন দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে তৃতীয় দফার হাড় কাঁপানো শীতে অচল হয়ে পড়েছে জনজীবন। এলাকায় দুদিন ধরে সূর্যের দেখা মেলেনি। দিনে-রাতে তীব্র হিমেল হাওয়া বয়ে যাওয়ায় শীতে কাঁপছে ছিন্নমূলসহ সর্বস্তরের মানুষ। ঘন কুয়াশার সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে ছিন্নমূল পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে দুর্যোগ। এদিকে ঘন কুয়াশাসহ তীব্র হিমেল হাওয়ার কারণে কর্মজীবী মানুষ ঘরের বাইরে কাজে যেতে পারছে না। জীবিকার তাগিদে যারা মাঠে-ময়দানে কাজ করতে যাচ্ছেন তারাও বেশিক্ষণ কাজে টিকতে পারছেন না। বেকার হয়ে পড়েছেন রিকশা-ভ্যান, চাতাল শ্রমিকসহ দিনমজুররা। তীব্র শীতের কারণে বৃদ্ধ ও শিশুদের শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়াও প্রতিদিন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডাক্তারদের কাছে শতাধিক নতুন রোগী ভিড় জমাছে।
রাজশাহী অফিস জানায়, মঙ্গলবার রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটাই মঙ্গলবারের সারা দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বলে জানা গেছে। চলতি মৌসুমেও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা এটাই। গত কয়েকদিন ধরে রাজশাহীতে তাপমাত্রা কমছে। বাড়ছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। টানা মৃদু শৈত্যপ্রবাহের কবলে পড়ে ব্যাহত হচ্ছে রাজশাহী মহানগরে বসবাসকারী জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
হিমালয় ছুঁয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসে কাঁপছে ছিন্নমূল মানুষ। পথের ধারে খড়-কুটোয় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা যাচ্ছে তাদের।

অতিরিক্ত ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে বাড়ছে শীতজনিত রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা।