ট্রাক চালক লিটনের সংসার কীভাবে চলবে

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:০৫

‘স্যার, আমার চোখ দুটো ভালো করে দেন। আমি গাড়ি না চালালে সংসার চলে না। গাড়ি চালিয়ে আমি সংসার চালাই। আমার বউ-পোলা না খাইয়া মরবো, দয়া করে আমাকে সুস্থ করে দিন।’ পেট্রোল বোমায় দুই চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়া ট্রাক চালক লিটন মিয়া (৩৫) কোন চিকিত্সক তার বিছানার কাছে গেলে এমন আকুতি জানান। গত সোমবার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আফম রুহুল হক ও বিএমএ’র নেতৃবৃন্দ শেরেবাংলা নগর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে অবরোধে পেট্রোল বোমা ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগে দগ্ধ রোগীদের দেখতে যান। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে দলটি ট্রাক চালক লিটন মিয়ার কাছে গেলে তখনও তিনি একই আকুতি জানান।

লিটনের শয্যাপাশে তার স্ত্রী সুইটি আকতার ঐ সময় দুই চোখের পানি ছেড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। সুইটি বলেন, আমার স্বামী ট্রাক চালিয়ে যা পায় তা দিয়ে কোনরকমে সংসার চলে। সংসারে একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। এখন আমরা কি খামু, কেমনে চলমু।
দুই ছেলে তাদের। বড় ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ও ছোট ছেলে প্লেতে পড়ে। লিটন মিয়া চাইতেন তার সন্তানদের যেন এ পেশায় না আসতে হয়। এ কারণে বিরামহীনভাবে ট্রাক চলাতেন। অধিক পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন। তার দুই পুত্র লেখা পড়া করে সুশিক্ষিত হবে। লোকে বলবে ট্রাক চালক লিটন মিয়ার পুত্ররা শিক্ষিত এবং বড় চাকরি করে। এমন স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেই স্বপ্ন নিমিষেই চূর্ণ হয়ে গেল একটি পেট্রোল বোমার আঘাতে। লিটন মিয়ার (৩৫) সংসার এখন কিভাবে চলবে? তার দুই চোখের আলো যে নিভে গেছে। ১৪ জানুয়ারি রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মাল বোঝাই করে তিনি মাগুরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। প্রহরার মধ্যে গাড়ি নিয়ে কিছু দূর গেলে অবরোধকারীরা লিটন মিয়ার ট্রাক বরাবর পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। বোমাটি তার মুখমণ্ডলে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ট্রাকে। ঐ সময় চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না তিনি। এ অবস্থায় ট্রাক থেকে লাফিয়ে পড়েন। তিনি কিসের উপর পড়ছেন তাও দেখতে পাননি। সেখান থেকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। পরদিন তাকে ঢাকা চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। এ ইনস্টিটিউটের চিকিত্সকরা পরীক্ষা করে দেখেন যে, লিটন মিয়ার বাম চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। এ চোখে আর দেখতে পারবেন না। ডান চোখেও স্প্লিন্টার ঢুকে রয়েছে। কর্নিয়া প্রায় নষ্ট, চোখে ঝাপসা দেখছেন। তিনি আর দুনিয়া দেখতে পারবেন না।
লিটন মিয়া জানান, তিনি ১৭ বছর ট্রাক চালিয়ে আসছেন। তার ছিল সুখের সংসার। এক পেট্রোল বোমা তার সংসার ছারখার করে দিল। স্ত্রী, সন্তানরা  চরম দুরাবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ। তার সুখের সংসার যারা কেড়ে নিয়েছে, আল্লাহ যেন তাদের সুখ কেড়ে নেয় এ ফরিয়াদ জানান লিটন।
ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার দহকুলা গ্রামের বাসিন্দা লিটন মিয়া। তার কোন জায়গা জমি নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্যান্য দগ্ধ রোগীদের ন্যায় তারও চিকিত্সা সেবার ব্যয়ভার গ্রহণ করেছেন। সংসারের খরচ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ডা. জুলফিকার আলী নিয়মিত রোগীদের চিকিত্সার খোঁজ-খবর নিচ্ছেন ।

চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ জালাল আহমেদ বলেন, ট্রাক চালক লিটন মিয়ার এক চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। অপর চোখটিরও অবস্থা খারাপ। তার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে তিনি জানান।