রাজধানীর মহাখালীতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের একটি মেস থেকে শতাধিক হাতবোমা ও বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ সংগঠনের পাঁচ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এরা হলেন-শিবিরের বনানী থানার সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান (২৩), কর্মী জয়নাল আবেদিন (২০), আরিফুজ্জামান আরিফ (১৮), আতিয়ার রহমান (২২) ও খালিদ সাইফুল্লাহ (১৯)। গতকাল বুধবার ভোরে মহাখালীর টিবি গেইট এলাকার একটি মেস থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয় বলে বনানী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ভুঁইয়া মাহবুব হোসেন জানান। এদিকে যশোরের কেশবপুর উপজেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি আল আমিনকে (২৪) পেট্রোল বোমা ও পাইপগান তৈরির সরঞ্জামসহ আটক করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুর ২টার দিকে উপজেলা সদরের আহলে হাদীস মসজিদের পাশ থেকে পুলিশ তাকে আটক করেছে। এসময় আরও তিনজন পালিয়ে গেছে।
বনানী থানার ওসি বলেন, ভোর ৪টার দিকে টিবি গেইট এলাকার একটি ভবনের তৃতীয়তলায় অভিযান চালিয়ে শিবির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই বাসা থেকে ১৩০টি হাতবোমার পাশাপাশি দুই লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়, যা পেট্রোল বোমা হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা হয়েছিলো বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এছাড়া বোমা তৈরির সরঞ্জামের মধ্যে গান পাউডার এক কেজি, ১০ কেজি পাথরের টুকরো ও তিন কেজি তারকাঁটা উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃত শিবিরকর্মীদের মধ্যে একজন বোমা তৈরিতে দক্ষ জানিয়ে ওসি বলেন, অবরোধে নাশকতা চালানোর জন্য ওই বাসায় বোমা তৈরি করা হচ্ছিলো। পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার লুত্ফুল কবির জানান, কয়েক মাস আগে টিবি গেইট এলাকার চ ব্লকের ১৩৩/১ নম্বর আমিনুল ইসলাম ভিলা নামে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে মেস করে থাকা শুরু করে শিবির নেতাকর্মীরা।
গ্রেফতারকৃতদের পরিচয় জানিয়ে তিনি বলেন, শিবির নেতা মোস্তাফিজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তিনি গাজীপুরের কালীগঞ্জের হারুনুর রশিদের ছেলে। এছাড়া জয়নাল প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, আরিফ ঢাকা পলিটেকনিকের আর্কিটেকচারের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র, গাইবান্ধার ছেলে আতিয়ার তিতুমীর কলেজের ইংরেজি বিভাগের শেষবর্ষের ছাত্র। আর এইচএসসি পাস করে ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আসা খালিদ তিতুমীর কলেজে ভর্তির অপেক্ষায় আছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত ৫ জানুয়ারি সারাদেশে লাগাতার অবরোধের ডাক দেয়ার পর প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমাবাজি, গাড়ি ভাংচুর ও গাড়িতে বোমা ছুঁড়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে।
গত ১৬ দিন ধরে অবরোধে নাশকতায় অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নাশকতা ও হত্যাকাণ্ডের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের দায়ী করা হলেও তারা তা অস্বীকার করছেন। এ ঘটনার পর তাত্ক্ষণিকভাবে পুলিশের মহাপরিদর্শক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার করে মোট এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেন অভিযানে থাকা পুলিশ দলটিকে। বনানী থানার ওসি জানান, পুলিশ সদস্যদের উত্সাহ দিতেই এই পুরস্কার। পুলিশ জানায়, আটককৃতরা রাজধানীতে বিভিন্ন নাশকতার জন্যে অভিনব কৌশল অবলম্বন করতো। তারা প্রথমে রাস্তায় পেরেক ছড়িয়ে দিতো। এই পেরেকের মাধ্যমে তারা গাড়ির চাকা পাংচার করতো। এরপর গাড়ি থেমে গেলে গাড়িতে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিতো। বনানী থানার ওসি জানান, ওই বাসা থেকে ১৩০টি ককটেলের পাশাপাশি দুই লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়। ককটেল এবং পেট্রোল ছাড়াও এক কেজি গান পাউডার, ১০ কেজি পাথরের টুকরো, তিন কেজি পেরেক বা তারকাঁটা, ১২টি নতুন কসটেপ, তিন কেজি বান্ডেল তুলা, একটি কাঁচি, ১৫টি জর্দার খালি কৌটা, এক কেজি জর্দা, ১২টি বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও বই, ২৭টি খাকি রঙের খাম ও ছোট-বড় চারটি হিসাবের রেজিস্টার উদ্ধার করা হয়।
আমাদের যশোর অফিস ও কেশবপুর (যশোর) সংবাদদাতা কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল জলিলের বরাত দিয়ে জানান, কেশবপুর থানা পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে শহরের উপজেলা সড়কের আহলে হাদিস মসজিদের পেছনের একটি বাসা থেকে ইসলামী ছাত্র শিবিরের পশ্চিম শাখার সভাপতি আল আমিনকে (২৫) আটক করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে গোপন মিটিং করার সময় ৩ জন পালিয়ে যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর শিবির সভাপতির কক্ষের তালা ভেঙ্গে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম, টুকরো করে কাটা একাধিক জিআই পাইপ, বোতলজাত পেট্রোল, জেহাদী বই, বিভিন্ন এলাকার ভোটার তালিকা, ইসলামিক বই ও ২০টা বিভিন্ন ধরনের ব্যানার উদ্ধার করে। আটক আল আমিন খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার কল্যানশ্রী গ্রামের মৃত আলতাফ হোসেনের ছেলে।