আমেরিকার নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয় এমন পদক্ষেপ নেইনি

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০১৫, ০২:০০

রাজনৈতিক মতভেদ দূরে ঠেলে আমেরিকানদের স্বার্থে কংগ্রেসকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের আহ্বান জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ভবিষ্যত্ বংশধরের জন্যে নিরাপদ আমেরিকা তথা নিরাপদ বিশ্ব গড়ার স্বার্থে জলবায়ু পরিবর্তনের আশংকা দূর করতে গত ৬ বছরে আমেরিকা যেভাবে কাজ করেছে, ঐ ধারাকে আরো বেগবান করার সংকল্প ব্যক্ত করেন ওবামা। তিনি বলেন, আমেরিকার নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয় এমন কোন পদক্ষেপ আমি কখনো নেইনি।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে এক ঘণ্টার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ওবামা দৃপ্ত প্রত্যয়ে ঘোষণা করলেন যে, নয়া শতাব্দীর ১৪ বছরে যত সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তা দূর করতে আমরা অনেকটা সক্ষম হয়েছি ঐক্যবদ্ধভাবে পদক্ষেপ গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে। অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতেও আমরা অনেকখানি অগ্রগতি সাধন করেছি। ১৯৯৯ সালের পর গত ৫ বছরে আমেরিকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। ১১ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা বিস্তারেও আমাদের অহংকার করার মত ঘটনা ঘটেছে।
৯/১১-তে সন্ত্রাসী হামলার পর আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সাথে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তার মাধ্যমে সন্ত্রাস নির্মূলে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি, বলেন ওবামা। তিনি বলেন, ইরাক ও আফগানিস্তানে ৬ বছর আগে পর্যন্ত এক লাখ ৮০ হাজার মার্কিন সৈন্য কাজ করেছে। এখনও ১৫ হাজারের মত সৈন্য দুটি দেশে রয়েছেন আফগান-ইরাককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য।
ওবামা বলেন, মিনেসোটার নবদম্পতি রেবেকা এবং বেন এরলার আমাকে ৬ বছর আগে লিখেছিলেন, তাদের অর্থনৈতিক মন্দার কথা। সংসারে অতিথি আসছে, তাকে কী খাওয়াবে-সে শংকাও প্রকাশ করেছিলেন এই দম্পতি। তাদেরকে আমি আজ এখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। ৬ বছরের ব্যবধানে তারা এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সন্তানের জন্য আর কোন মাথা ব্যথা নেই। রেবেকার মত কঠোর পরিশ্রমী আমেরিকানরা এখন সুখের স্বপ্ন রচনা করতে সক্ষম হচ্ছেন। এটি সম্ভব হয়েছে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।
ওবামা বলেন, জ্বালানি সেক্টরেও আমরা পরনির্ভরতা হ্রাসের প্রক্রিয়ায় ছিলাম। এখন সেটি অর্জিত হয়েছে। আমেরিকা এখন তেল এবং গ্যাসের ক্ষেত্রে এক নম্বরে অবস্থান করছে। ওবামা বলেন, আমাদের প্রজন্মকে আরো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পাড়তে হবে এবং সে  ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে তাদেরকে তৈরি করার দায়িত্বও  আমাদের। সে আলোকে আমি বলতে চাই যে, আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা এখন অংক এবং রিডিংয়ে অত্যন্ত উঁচুতে রয়েছে। এখন সবচেয়ে বেশি আমেরিকান কলেজ গ্র্যাজুয়েশনে সক্ষম হচ্ছে।
ওবামা বলেন, শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে আমরা বদ্ধপরিকর। গত বছরও কোটি আমেরিকানের বেশি মানুষ হেল্্থ কভারেজ পেয়েছেন। মাঝারি আয়ের আমেরিকানদের অর্থনীতির ভীত মোটামুটি মজবুত হয়েছে। এটি বড় ধরনের সাফল্য আমাদের সকলের। তবে সকলকে আরো কঠোর শ্রম দিতে হবে এবং প্রশাসনকেও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের অবস্থা যত ভালো হবে, ততই সুসংহত হবে আমেরিকার অর্থনীতি। চলতি বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার মত আয়ের পথ সুগম রাখতে হবে এবং এটি হচ্ছে মধ্যম শ্রেণীর মানুষের জীবনমানের পরিমাপ। সে আলোকে স্বল্প আয়ের কর্মজীবী পরিবারের জন্যে ট্যাক্স হ্রাসের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। ওবামা বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্যসেবাকে অবজ্ঞার অবকাশ নেই। তাহলে আমাদের ভবিষ্যত্ বিপন্ন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, একটি বিষয়ে সকলকে খেয়াল রাখতে হবে। সেটি হচ্ছে, কর্মজীবীরা অসুস্থ হলে তাকে বেতনসহ ছুটি প্রদান এবং সন্তান প্রসবকালীন ছুটি থাকতে হবে নারী শ্রমিকের জন্য। এ ছুটি তারা পাবেন বেতনসহ। ওবামা উল্লেখ করেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, ৪ কোটি ৩০ লাখ আমেরিকান শ্রমিক এখনও অসুস্থ হলে বেতনসহ ছুটি পান না। এ অবস্থা চলতে পারে না। আমার কাছে একটি বিল পাঠান, যেখানে বেতনসহ ছুটির বিধি থাকবে অসুস্থ কর্মচারির জন্য। বিষয়টি করার এখনই সময়। তিনি বলেন, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির আহ্বানে অনেকেই এখনও সাড়া দেননি। বার্ষিক ১৫ হাজার ডলার যারা আয় করেন, তাদের পরিবার চলে কীভাবে সেটি ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে কংগ্রেসের। নিম্ন আয়ের এসব মানুষদের কথা বিবেচনা করে কংগ্রেসের উচিত সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ওবামা বলেন, আমাদের কলেজের ছাত্র-ছাত্রীর ৪০ ভাগ যাচ্ছেন কম্যুনিটি কলেজে। আমরা চাই যে, পরিবর্তনশীল বিশ্বের উপযোগী কাজ করার শিক্ষালাভ করুক আমাদের সন্তানরা। কারণ, সামনের দিনে যত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে তার প্রতি ৩টির মধ্যে ২টিতেই উচ্চ শিক্ষিত নাগরিক লাগবে। সে সমস্যা বিবেচনায় রেখে আমেরিকানদের এগুতে হবে। ঢেলে সাজাতে হবে শিক্ষাব্যবস্থা।
ওবামা বলেন, ২০১০ সালের পর ইউরোপ, জাপান এবং এগিয়ে চলা বিশ্বের চেয়ে আমেরিকায় বেকারত্ব হ্রাস অনেক বেশি। আমাদের শিল্প-কারখানায় ৮ লাখের বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে-যারা উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন। আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি পণ্য আমরা রপ্তানি করছি। এতদসত্ত্বেও চীন চাচ্ছে সবার ওপরে থাকতে। আমরা সেটি দেখতে চাই না। আমাদেরকে এগিয়ে থাকতে হবে এবং সেভাবেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। সে কারণে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং উন্নয়ননির্ভর হয়ে পড়েছি আমরা। গবেষণার মধ্য দিয়ে আমরা ভয়ংকর রোগ প্রতিরোধেও সক্ষম হচ্ছি। ইবোলা প্রতিরোধে আমাদের লোকজন আফ্রিকায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। আমরা সবসময় চাচ্ছি ইন্টারনেট ফ্রি রাখতে এবং প্রতিটি আমেরিকানের জন্য তা ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করতে। তথ্য-প্রযুক্তির সব ধারাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে আমেরিকার বিজ্ঞানীরা যাতে নয়া বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণে সক্ষম হন সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।
ওবামা বলেন, বহির্বিশ্বে কাজ করে অনেক কোম্পানি সম্পদের পাহাড় গড়ছে। এদের ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ট্যাক্সের ঐ অর্থে স্বল্প আয়ের শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
ওবামা বলেন, কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে আমার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আমেরিকাকে নিরাপদ রাখা এবং যে কোন ধরনের হুমকির মোকাবেলায় সদাপ্রস্তুত থাকা। আমি সেটি করছি। এ ব্যাপারে আমেরিকার নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয় এমন কোন পদক্ষেপ আমি নেইনি। সকলের সাথে সম্পর্ক অটুট রেখে আন্তর্জাতিকভাবে আমেরিকার নেতৃত্ব বহাল রাখতে আমি বদ্ধপরিকর। এ প্রসঙ্গে তিনি কংগ্রেসের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, আমেরিকার প্রতি গোটা বিশ্বের আনুগত্য প্রশ্নের মুখে পড়ে এমন কোন কাজে আমি সায় দেব না। ওবামা বলেন, ইসলামিক স্টেটের নামে মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্য অঞ্চলে সন্ত্রাসী তত্পরতা রোধে কংগ্রেস ঐক্যবদ্ধ রয়েছে-সেটি আমার জন্য সুখের বিষয়। এভাবেই আমরা আমাদের কূটনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনে সক্ষম রয়েছি। ওবামা বলেন, ইরানের ব্যাপারেও আমাদের কূটনৈতিক তত্পরতা সাফল্য দেখছে। নিউক্লিয়ার প্রশ্নে ইরান আগের মত কট্টর অবস্থানে নেই। আলোচনার মধ্য দিয়েই উত্তাপ কমেছে মধ্যপ্রাচ্যে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও সন্ত্রাসবাদ দমনে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। ওবামা বলেন, আমেরিকা তার নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এজন্য কোন শক্তি নেই যারা আমেরিকার নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে পারে। এমনকি আমেরিকার ব্যবসায়িক সিক্রেটও কেউ চুরি করতে পারবে না। যে কোন ধরনের সাইবার হুমকি আমরা গুড়িয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছি। ওবামা বলেন, সন্ত্রাসবাদের জন্য যারা অনেকাংশে দায়ী আমরা তাদের সাথেও আলোচনায় বসেছি বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়ার স্বার্থে। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ছাড় দিয়েছি। মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কে নয়ামাত্রা যোগ হয়েছে।

ওবামা বলেন, আমরা ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারে শ্রদ্ধাশীল। এজন্য ইমিগ্রেশন ইস্যুতে রাজনৈতিক মতভেদের উর্ধ্বে উঠতে চাই। নভেম্বরের নির্বাচনের আগের অবস্থা এখন নেই। এখন সময় এসেছে ডেমক্র্যাট এবং রিপাবলিকানদের ঐক্য গড়ার এবং সেই ঐক্যকে ইমিগ্রেশন ইস্যুতে কাজে লাগাতে হবে। ওবামা বলেন, এই কংগ্রেসের অনেকের সাথেই আমি কাজ করেছি। অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তাই আশা করছি, সামনের বছরে আমরা যেন আমেরিকার মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে কাজ করতে পারি। আমরা যেন আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে সক্ষম হই।