বাংলার হিন্দু/ বাংলার খ্রিস্টান/ বাংলার বৌদ্ধ/ বাংলার মুসলমান/ আমরা সবাই বাঙালি। বাঙালি জাতিসত্তার এ যেন মূল মন্ত্র। বাঙালি এই মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়েই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত ও তিন লাখ মা বোনের ইজ্জত হারানোর মধ্যে দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে অবস্থান করে নেয় একটি নাম বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশে সেই রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর লোকেরা কিছু মানুষের নিজ স্বার্থ চরিতার্থের জন্য সুযোগ পায় রাজনীতি করার এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হওয়ার। সময়ের আবর্তে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যে স্বাধীনতার পক্ষের দল বসতে পারে সে হিসেব হয়তো বিরুদ্ধ শক্তির এই গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ধারণায় ছিল না। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যেসকল ব্যক্তি যুদ্ধাপরাধের দায়ে চিহ্নিত ও অভিযুক্ত হয়েছিল তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায় বাংলাদেশ সরকার। বিচার প্রক্রিয়া শেষে তাদের ফাঁসির রায় হয়। ফাঁসির রায়ে দণ্ডিত এই ব্যক্তিদের রাখা হয় কনডেমড সেলে। ফাঁসির এই মিছিলে সারথি ছিল কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, সাকা চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন সাঈদীসহ আরও অনেকে। এদের মধ্যে অবশ্য চান্দের হুজুর খ্যাত সাঈদীর রায় পাল্টে যায়।
কনডেমড সেল নাটকের কাহিনি গড়ে ওঠে ফাঁসির রায়ে দণ্ডিত এইসব আসামিদের অভিজ্ঞতা, দায়, অভিব্যক্তি আর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের মধ্যে দিয়ে। অবশ্য নাট্যকার অনন্ত হিরা দলের স্যুভিনিয়রে তার দায়মুক্তি ঘটিয়েছেনে এই বলে যে সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই অপশক্তির দল এত বেশি সংগঠিত এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে তাদের কোনো ক্রমেই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে তাদের ফাঁসি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বিধি বাম! একে একে যখন তাদের ফাঁসি কার্যকর হতে শুরু করল তখন তাদের মধ্যে ভয় দানা বাঁধতে শুরু করল। এর মধ্যে তো চাঁদে সাঈদীকে দেখে দেশে জ্বালাও পোড়াও শুরু হয়ে গেল। হানাদার বাহিনীর দোসররা ভাবতে লাগল বাংলার মানুষ বোধহয় তাদের পক্ষে। কিন্তু শাহবাগ আন্দোলন এবং রায় কার্যকর ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকলে সে ভ্রম কাটতে থাকে।
প্রাঙ্গণেমোরের ১০তম প্রযোজনা ‘কনডেমড সেল’ নাটকের নির্দেশক আউয়াল রেজা। এটি প্রাঙ্গণেমোরে তার নির্দেশিত প্রথম নাটক। নির্দেশনার ক্ষেত্রে তিনি খুব একটা কারিকুরি দেখানোর চেষ্টা করেননি। সেক্ষেত্রে সহজভাবে গল্পটা বলার চেষ্টা করেছেন ও পেরেছেন।
জানা ঘটনার গল্প বাঁক নিতে থাকে নাটকের সংযোগকারী চরিত্র ওসমানের কারণে আর সেই সঙ্গে যোগ হয় কারারক্ষী নসু। নাট্যকার অনন্ত হিরা ওসমানকে যেভাবে উন্মোচন করেছেন তা সত্যিই অসাধারণ। ওসমান মধ্যবিত্ত সমাজের একজন প্রতিনিধি। একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শে উজ্জীবিত একজন তরুণ সে। যৌবনে সেই দলের উত্থানে বিগড়ে যাওয়া মানুষ। অর্থলোভে জড়িয়ে পড়ে নানা অপকর্মে। ওসমানের প্রতি জেলারের বাড়তে থাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। কেননা সে ১৯৭১ সালে কর্নেল তাহেরের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করেছিল। শিক্ষিত, মার্জিত একজন মানুষ সে। রাজনৈতিক পথভ্রষ্টতার কারণে সে নিজেও একজন ফাঁসির আসামি—জল্লাদ। তার জেল জীবনে সে অনেককে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে কিন্তু তৃপ্তি পেয়েছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তকে ঝুলিয়ে। যুদ্ধাপরাধীরা যে কতটা ঘৃণিত আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ওসমানের মাধ্যমে। ওসমান চরিত্রে অভিনয়ে অনন্ত হিরাও হয়ে ওঠে ভিন্নরূপ। আর ‘কনডেমড সেল’ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিচিত্র।
নাটকের আরেক চরিত্র কারারক্ষী নসু। জেলখানায় আছে অনেক বছর। বোধ-বুদ্ধিতে কিছুটা খাটো হলেও পয়সার বেলায় তার হিসেব ষোলআনা। এসব অবশ্য জেলখানার কয়েদিদের কাছ থেকেই শেখা তার। নোয়াখালীর নসু বেশ রসিকও বটে। দোষে গুণে নসু ভরপুর। সেই দোষত্রুটিগুলোকে অভিনেত্রী নূনা আফরোজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। অসাধারণ অভিনয় করেছেন তিনি। তার অভিনয় জীবনের সেরা অভিনয়টা দেখিয়েছেন বললেও ভুল বলা হবে না হয়তো। তার অভিনয় মুগ্ধতায় দর্শক বিমোহিত হয়ে থাকে। আর বরাবরের মতোই ভালো অভিনয় করেছেন মিয়া ভাই চরিত্রে সবুক্তগীন শুভ, চান্দের হুজুর চরিত্রে জাহিদুল ইসলাম ও অন্যরা। তবে তাদে মধ্যে বেশি করে নজর কাড়ে বদ্দা চরিত্রে রামিজ রাজু।
ফয়েজ জহিরের সাদাসিধে মঞ্চে তৌফিক আজীম রবিনের আলো বেশ ফুটফুটে। দারুণ সংগীত করেছেন রামিজ রাজু। আর পোশাক করেছেন শুভেচ্ছা রহমান।
