যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের আরো বড় ভূমিকা থাকা দরকার। এই অঞ্চলে অবশ্যই নৌ-চালনার (নেভিগেশন) ক্ষেত্রে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে সকল বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে হবে। অন্যদিকে, প্রতিটা মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশ তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী হয় যখন সকল নাগরিক সমান মর্যাদা ও সুযোগ পায়। গতকাল দিল্লির সিরি ফোর্ট অডিটোরিয়ামে দেয়া এক টাউন হল ভাষণে ওবামা এ কথা বলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণে দেশ, রাজনীতি, ধর্ম, উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যক্তিগত কথাও উঠে এসেছে।
তরুণ শিক্ষার্থী, এনজিও, মানবাধিকার কর্মীসহ প্রায় দুই হাজার ভারতীয় নাগরিকের সামনে দেয়া ভাষণে ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত যদি সত্যিকারের বৈশ্বিক অংশীদার হতে চায় তবে তাদের একসঙ্গে অবশ্যই আরো অনেক কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও শান্তি স্থাপনে কাজ করা বিংশ শতকে প্রতিষ্ঠিত বহুপক্ষীয় সংস্থাকে একুশ শতকের জন্য যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্য পদের বিষয়ে সমর্থন দেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, বিশ্বের বৃহত্ দুই গণতান্ত্রিক দেশ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে। যে কারণে জনগণকে রক্ষা করতে দুই দেশ একসঙ্গে দাঁড়িয়েছি। নতুন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো জোরদার করছি। পারস্পারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারি। তিনি বলেন, ভারত শুধু প্রাকৃতিগত অংশীদার হবে না বরং শিক্ষা থেকে শুরু করে পরিবেশ, অবকাঠামো ও সন্ত্রাস দমনের মতো ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অংশীদার হতে পারে। একইসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব আমাদের সকলের অভিন্ন লক্ষ্য হওয়া উচিত।
প্রায় ৩৫ মিনিটের ভাষণে ওবামা দুই দেশের তরুণদের স্বপ্ন ও সুযোগের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, বৈষম্যময় বিশ্বে একমাত্র স্বপ্নই মানুষকে উত্তরণের পথে নিয়ে যেতে পারে। বিষয়টির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত কথায় চলে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে রাঁধুনির কাজ করতেন তার দাদা। শুধু তাই নয়, স্ত্রী মিশেলের পরিবার যে এককালে দাস ছিল সে কথাও প্রকাশ্যে বলেন তিনি। ওবামা বলেন, রাঁধুনির নাতি যদি প্রেসিডেন্ট হতে পারে, চা-ওয়ালা যদি প্রধানমন্ত্রী হয়, তা হলে স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়! প্রত্যেকেরই সুযোগ রয়েছে।
ভারতে এসে নারীশক্তির জয় দেখে উচ্ছ্বসিত বারাক ওবামা। রাষ্ট্রপতি ভবনে তাকে গার্ড অব অনার দিয়েছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনার উইং কমান্ডার পূজা ঠাকুর। এ কথা উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, একটি দেশ তখনই সফল যখন সেদেশের নারীরা সফল।
অন্যদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়ে ওবামা বলেন, ধর্মকে সন্ত্রাসের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। মহাত্মা গান্ধী বলতেন, আমার কাছে বিভিন্ন ধর্ম মানে, একই বাগানে, একই গাছের নানা শাখায় ফুটে থাকা অনেক রকম ফুল। প্রত্যেকের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের অধিকার রয়েছে। দেশ তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী হয় যখন সকল নাগরিক সমান মর্যাদা ও সুযোগ পায়। মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব সকল নাগরিক ও সরকারের।
গতকাল দিল্লিতে ছিলো বারাক ওবামার তিন দিনের সফরের শেষদিন। গতকাল দুপুরের পর সৌদি আরবের উদ্দেশে ভারত ত্যাগ করেন ওবামা। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী এয়ার ফোর্স ওয়ান নয়াদিল্লীর একটি সামরিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যায়। ওবামা নয়াদিল্লি ছাড়ার আগে ভারতকে ‘নমস্তে বলে বিদায় নেন। ভারত সফরের শেষদিনে ওবামার তাজমহল দর্শনের কথা ছিল। তবে নতুন সৌদি বাদশাহকে সম্মান জানাতে তিনি তার সফর সংক্ষিপ্ত করেন।
এদিকে, এক টুইট বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, ওবামার সফর ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে নতুন পর্যায় ও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ওবামাও টুইটারে তার এ স্মরণীয় সফর ও ভারতীয় জনগণ তাকে যে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছে তার জন্য মোদীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।