সাবেক রাষ্ট্রদূত ও ইত্তেফাকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আখতার-উল-আলমের মেয়ের হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের নাম ফাহমিদা আক্তার বীথুন (৪৭)। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর রামপুরা মহানগর প্রজেক্টের ৫ নম্বর রোডের ১০৫ নম্বর বাড়ির ৫ম তলা থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। দুই-একদিন আগে কোনো এক সময় শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের ধারণা।
রামপুরা থানার ওসি মাহবুবুর রহমান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ওই বাসা থেকে লাশটি উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে কে বা কারা এটি করেছে তা এখনও জানা যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এছাড়া মত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়না তদন্তের জন্য লাশটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
গতকাল সরেজমিনে ওই বাড়ির ৫ তলায় গিয়ে দেখা গেছে, লাশটি মেঝেতে উপুর হয়ে পড়েছিল। গলায় ছিল মাফলার প্যাঁচানো, হাত-পা ছিল বাঁধা এবং মুখে মরিচের গুঁড়া লাগানো। ঘরের মেঝেতে হলুদ ও মরিচের গুঁড়া ছিটানো ছিল। ওই বাড়ির এক বাসিন্দা জানান, গতকাল সকালে বাড়ির গৃহকর্মী এসে দরজায় নক করে সারা-শব্দ না পেলে তাদের ফ্ল্যাটে এসে জানায়। অনেক ডাকাডাকির পরে দরজা না খুললে কাজের মহিলা দারোয়ান ও আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। পরে দরজা জোরে লাথি মারলে এক পর্যায়ে দরজা খুলে যায়। ফাহমিদাকে হাত-পা বাঁধা, গলায় মাফলার প্যাঁচানো অবস্থায় মেঝেতে উপুর হয়ে পরে থাকতে দেখেন। এরপর তারা ফাহমিদার স্বজনদের এবং রামপুরা থানায় জানায়। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। প্রতিবেশীরা আরো জানান, ফাহমিদা ওই ভবনের ৫ম তলার ২টি ফ্ল্যাটের মালিক। একটিতে তিনি বসবাস করতেন, অপরটি মেস হিসেবে ভাড়া দেয়া ছিল। ফাহমিদার স্বামীর নাম গোলাম রাব্বানী। তিনি বাহরাইনে একটি প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যানসিয়াল কনসালটেন্ট হিসেবে কর্মরত। তাদের এক ছেলে, নাম সিরাতুল মোস্তাকিম। সে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।
রামপুরা বিভাগের খিলগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার নূর আলম বলেন, আলামত দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন ফাহমিদাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি ২৪ থেকে ৩৬ ঘন্টা আগে সংঘটিত হয়েছে বলেও ধারণা করছেন। তিনি আরো বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে ঘটনাটি চুরি বা ডাকাতি নয়। তবু তারা এ বিষয়সহ পারিবারিক বা পেশাগত কারণে কারো সঙ্গে কোনরকম শত্রুতা ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে।
ফাহমিদার মোবাইল ফোন পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছু মাথায় রেখে তদন্তকাজ এগুচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে বিষয়টি বুঝতে আরো সহজ হবে।
বাসার কাজের মহিলা সাবিহা বেগম বলেন, তিনি ওই বাসায় দুই বছর ধরে ‘ছুটা বুয়া’ হিসেবে কাজ করছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি ওই বাসায় কাজ করতে এসেছিলেন কিন্তু সারা না পেয়ে তিনি চলে যান। শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ওই বাসায় কাজ করতে আসেন। কিন্তু সে সময় দরজা না খুললে ও সারা শব্দ না পেলে তিনি ফাহমিদার মোবাইল ফোনে কল করেন। কিন্তু সে সময়ও কোন সাড়া শব্দ পাননি। পরে আশপাশের লোকজনকে ডেকে আনেন। তারা সবাই দরজা ধাক্কাধাক্কি ও লাথি দিলে এক সময় দরজা খুলে যায়। পরে দেখেন ফাহমিদা উপর হয়ে পড়ে আছেন।
ওই বাড়ির দারোয়ান আব্দুর রব বলেন, তিনি ওই বাড়িতে তিন মাস ধরে কাজে যোগদান করেছেন। এই তিন মাসে ফাহমিদাকে খুব একটা নিচে নামতে দেখেননি। গত ৩-৪ দিন আগে ফাহমিদা নিচে একবার নেমেছিলেন। গত ৩-৪ দিনে তিনি তার বাসায় কাউকে আসতে দেখেননি।
নিহতের বড় ভাই রেজওয়ান-উল-আলম ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, ফাহমিদা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট ছিলেন। স্বামী ও সন্তান বিদেশে থাকায় তার বোন ওই বাসায় একাই বসবাস করতেন। গত চারমাস আগে তার বোনের স্বামী গোলাম রাব্বানী বাংলাদেশে এসেছিলেন। হত্যার ব্যাপারে তিনি বলেন, কেন তার বোনকে হত্যা করা হয়েছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। কারো সঙ্গে ফাহমিদার শত্রুতা আছে কিনা তাও তিনি জানেন না। তিনি বলেন, এটি হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনা উন্মোচিত করে পুলিশ অপরাধীদের খুঁজে বের করবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ফাহমিদার লাশ বারডেম হিমঘরে রাখা হবে। তার স্বামী এলে তাকে দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বর্তমানে তিনি বাহরাইনে রয়েছেন। তিনি বলেন, জানা মতে তাদের পরিবারের সঙ্গে কারো বিরোধ নেই।
ঢামেক ফরেনসিক ডা: প্রদীপ বিশ্বাস নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন শেষে সাংবাদিকদের জানান, ভারি কোনো বস্তু দিয়ে নিহতের মাথায় আঘাত করে ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তার ভিসেরা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের আগে নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন রামপুরা থানার এসআই রফিকুল ইসলাম। নিহতের হাত-পা বাঁধা ছাড়াও নাকে-মুখে মরিচের গুঁড়া ছিটানো ছিল।
নিহত ফাহমিদার জা মনোয়ারা বেগম জানান, ৫ বছর আগে ফাহমিদারা ওই বাসায় উঠেন। সেখানে ফাহমিদা একাই থাকতেন। তার ছেলে মোস্তাকিম ‘এ’ লেভেল শেষ করে প্রায় দেড় বছর আগে আমেরিকায় পড়তে যায়।
ফাহমিদার বাবা আখতার-উল-আলম ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তাকে রাষ্ট্রদূত করে বাহরাইনে পাঠানো হয়। ২০১০ সালের ২৫ জুন মারা যান তিনি।
