ব্যবসায়িক কাজ ছিল কক্সবাজারে। আর এ সুযোগে স্ত্রী মাহফুজা ও স্কুলপড়ুয়া মেয়ে মাইশাকে সাগর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন যশোরের গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদার ও জেলা জাসদ নেতা নুরুজ্জামান পপলু। স্ত্রী কন্যাকে সাগর দেখানো হলো ঠিকই। কিন্তু হলো না বাড়ি ফেরা। ফেরার পথে তাদের বহনকারী বাসে দুর্বৃত্তের ছুঁড়ে মারা পেট্রোল বোমায় পুড়ে কয়লা হলেন পপলু ও মাইশা। মেয়ে ও স্বামীকে হারানো মাহফুজা বেগমও (৩৭) সামান্য দগ্ধ হয়েছেন। শুধু পপলু ও মাইশা নন, বাসের ভিতরে ঘটনাস্থলেই পুড়ে কয়লা হয়েছেন আরো অনন্ত পাঁচ যাত্রী। তারা হলেন— কক্সবাজারের চকরিয়ার গাইনাকাটা গ্রামের মৃত ছিদ্দিক আহমেদের ছেলে আবু তাহের (৪০) ও একই গ্রামের সালেহ্ আহমেদের ছেলে ইউসুফ (৪৫), নরসিংদীর পলাশ উপজেলার বালুরচরপাড়ার জসিম উদ্দিন মানিকের স্ত্রী আসমা আক্তার (৩৫) ও তার ছেলে মাহমুদুল হাসান শান্ত (১৩) এবং শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার দক্ষিণ গজারিয়া গ্রামের মৃত নজর খাঁর ছেলে ওয়াসিম (৪৫)। এ ঘটনায় দগ্ধ হয়ে বাসটির অন্তত ২৫ যাত্রী বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছেন।
এর মধ্যদিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা চলমান অবরোধ-হরতাল কর্মসূচির মধ্যে আরো একটি নারকীয় নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার ঘটনা ঘটলো। এর সাক্ষী হয়ে থাকলো আইকন পরিবহনের হতভাগা নৈশ বাসটি। কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পথে সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার সংলগ্ন জগমোহনপুরের নির্জন এলাকায় পৌঁছালে সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা সেটিকে লক্ষ্য করে দুটি পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে।
স্বামী ও মেয়েকে হারানো মাহফুজা বলেন, ঘটনার সময় বেশিরভাগ যাত্রীই ঘুমিয়েছিলেন। দুর্বৃত্তরা পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলে মুহূর্তের মধ্যেই বাসটির ভেতর-বাইরে আগুন জ্বলে ওঠে। হঠাত্ আগুন দেখে তিনি অন্য যাত্রীদের সঙ্গে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েন। খানিকবাদে জানতে পারেন তার স্বামী ও মেয়ে বাস থেকে নামতে পারেনি। যাত্রীদের আর্তচিত্কারে এক পর্যায়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা এসে উদ্ধার কাজে অংশ নেন। খবর পেয়ে চৌদ্দগ্রাম থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
আইকন পরিবহনের (এসি বাসের) ঢাকার অফিস ম্যানেজার মনজুর মোর্দেশ জানান, পেট্রোল বোমায় পুড়ে যাওয়া বাসটি ৩৬ সিটের– নন এসি। সোমবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে সেটি কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। এর শেষ গন্তব্য ছিল রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর।
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফকরুল ইসলাম জানান, যে স্থানে নাশকতার ঘটনা ঘটলো তার আশপাশে এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে কোন জনবসতি নেই। তিনি বলেন, আক্রান্ত বাসটি পুলিশ প্রহরার বাইরে ছিল। ঘটনার আধা ঘন্টা আগে পুলিশ প্রহরায় চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের শতাধিক গাড়ি ঘটনাস্থল অতিক্রম করে।
লাশ হস্তান্তর :
কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক কিশোর কুমার জানান, লাশ উদ্ধারের পর সেগুলো কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। ময়না তদন্ত শেষে নিহত ৭ জনের মধ্যে ৬ জনের লাশ গতকাল বিকালে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ওয়াসিমের লাশ আজ বুধবার হস্তান্তর করা হবে।
নিহত পপলুর ভাই আসাদুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালের মর্গে থাকা তার ভাই ও ভাতিজীর লাশ শনাক্ত করেন।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আসা নিহতদের প্রতি পরিবারকে গতকাল বিকালে ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেন এবং আহতদের প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেবার ঘোষণা দেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬ জনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক: ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন দগ্ধদের মধ্যে ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। তারা হলেন— কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সালেহ্ আহমেদের পুত্র কাঁচামাল ব্যবসায়ী হানিফ (৩৬), একই উপজেলার প্রহরচন্দা গ্রামের সৈয়দ আহমেদের পুত্র রাশেদুল ইসলাম বাদশা (৪২), নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার সোনারগাঁও গ্রামের আলাউদ্দিনের পুত্র শফিকুল ইসলাম (২৪), ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামের আমির আলী শিকদারের পুত্র আরিফ শিকদার (১৮), একই গ্রামের শরিফুল ইসলামের পুত্র জিলকদ আহমেদ (২২) ও মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার কমলনগর গ্রামের আবদুস সালামের পুত্র ফারুক আহমেদ (২৩)।
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সার্জন ও সহকারী অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. তাইয়েবুল ইসলাম জানান, দগ্ধদের মধ্যে জিলকদ, বাদশা ও শফিকুলের অবস্থা আশংকাজনক। তাদের শরীরের ৭৪ থেকে ৭৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
কুমিল্লায় চিকিত্সা নেন যারা: কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা নেয়া আহতরা হলেন– যশোরের নিহত পপলুর স্ত্রী মাহফুজা বেগম মিতা, আবুল কালামের পুত্র আলী হোসেন, জহিরুল ইসলামের পুত্র জিলকদ, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার কালিরবাজার গ্রামের আলমগীর হোসেনের পুত্র রাতুল, কক্সবাজারের টেকনাফের নুরুল আলমের পুত্র মোহাম্মদ, একই জেলার চকরিয়ার বানিয়াছড়ি গ্রামের নবী মিয়ার পুত্র জমির আলী, পাহাড়িকান্দা গ্রামের সালেহ আহমেদের পুত্র হানিফ, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার কাকাইয়াকান্দি গ্রামের জাকির হোসেনের পুত্র সালাউদ্দিন, আবদুল লতিফের পুত্র ইমান আলী, আকবর আলীর পুত্র আমির হামজা, আফাজ উদ্দিনের পুত্র বাবু, একই গ্রামের মাইনুদ্দিন, আলাউদ্দিন, গফুরনগর গ্রামের আকবর আলী, হাসনাবাদ গ্রামের আবদুর রাজ্জাকের পুত্র বাবুল, নরসিংদীর পলাশের জসিম উদ্দিনের পুত্র মুন্না, জামালপুরের শিমরাইল উপজেলার কমলনগর গ্রামের ইউসুফ মোল্লার পুত্র শরীফ, নোয়াখালীর মাইজদীর সোনাপুর এলাকার মৃত আবুল কালামের পুত্র দুলাল।
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম জানান, বাসের চালক দুলাল সুস্থ আছেন। তবে হেলপারের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রতিবাদ মিছিল:এ নাশকতার প্রতিবাদে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীসহ এলাকার হাজার হাজার মানুষ মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে। তারা দুর্বৃত্তদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানায়।
রেলমন্ত্রীর পরিদর্শন: ভয়াবহ এ নাশকতার খবর শুনে রেলপথমন্ত্রী ও স্থানীয় এমপি মো. মুজিবুল হক গতকাল দুপুরে ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি উপজেলার মিয়াবাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এলাকাবাসীর আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় বলেন, বোমা মেরে মানুষ হত্যা করে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় যেতে পারবেন না। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সামছুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সেলিম, আলী হোসেন, নুরুল ইসলাম হাজারী, আবদুল বারেক, শাহজালাল মজুমদার, মাহবুব হোসেন মজুমদারসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ। পরে রেলপথমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্থানীয় একটি হোটেলে পুলিশ ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। ওই বৈঠকে রেলপথমন্ত্রী যে কোন মূল্যে দুর্বৃত্তদের অবিলম্বে গ্রেফতারের জন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম পিপিএম, কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল, হাইওয়ে পূর্বাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম, কুমিল্লা পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তী, র্যাব-১১ এর উপ-পরিচালক লে. কমান্ডার গুলজার হোসেন, চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি উত্তম চক্রবর্তী।
তদন্ত কমিটি গঠন: কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল বলেন, এ নাশকতার ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. গোলামুর রহমানকে আহবায়ক করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যরা হলেন কুমিল্লার সহকারী পুলিশ সুপার সদর এ সার্কেল জাহাঙ্গীর আলম ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবময় দেওয়ান।
পুরস্কার ঘোষণা: পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তী জানান, দুর্বৃত্তদের সম্পর্কে তথ্য প্রদান ও তাদের গ্রেফতারে সহযোগিতাকারীকে এক লাখ টাকা পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছি। এক্ষেত্রে নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে।
চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি উত্তম চক্রবর্তী বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে থানায় থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। দুর্বৃত্তদের গ্রেফতার করতে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর এর আগে রংপুরের মিঠাপুকুরে বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় ৬ জন এবং রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ১ জন নিহত হয়।
জাতীয় পার্টি– জেপি’র নিন্দা
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাত্রীবাহী বাসে সন্ত্রাসীদের পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি ও মহাসচিব ও সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। নেতৃদ্বয় এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় বলেন, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসের ওপর দুর্বৃত্তের পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ফলে ৭ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হয়েছেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলায় আহত ও নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিবৃতিতে এই সকল ঘটনায় নিহত হওয়ায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
আহতদের সুচিকিত্সার জোর দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, এই কাপুরুষোচিত হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে বিচারের ব্যবস্থা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। মানুষ হত্যা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কখনও রাজনীতির অংশ হতে পারে না। দেশবাসীর প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে এই সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তারা।