কথা উঠিয়াছে যে, আমলারা কী করে? ইঙ্গিতটা অস্পষ্ট নহে। এই প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। রাষ্ট্রপরিচালনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হইল আমলাতন্ত্র। অতএব, রাষ্ট্র চালাইতে হইলে আমলা লাগিবে। তাহারা আইন ও বিধিবিধানের ভিতরে থাকিয়া প্রশাসন পরিচালনা করেন। একই সঙ্গে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ তথা ভারসাম্য বিধান করেন সরকারের। বস্তুত রাজনীতি ও প্রশাসনের মধ্যে ভারসাম্য আনয়নের লক্ষ্যেই এই আমলাতন্ত্রের সৃষ্টি। অবধারিতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাও তাহাদের দায়িত্বের অন্তর্গত। কারণ চালকের আসনে যাহারা থাকেন— সেই রাজনীতিবিদদের নানা সীমাবদ্ধতা থাকে। এইজন্যই আমলাবিহীন কোনো দেশ খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না পৃথিবীতে। কিন্তু যখনই এই প্রশাসনকে রাজনীতিকীকরণ, দলীয়করণ— বিশেষত ‘ক্যাডার’ভুক্ত করা হয়, তখন যে উদ্দেশ্যে এই আমলাতন্ত্র সৃষ্টি করা হইয়াছিল তাহা ব্যর্থ হইয়া যায়। এমনকী কোনো কোনো দেশে ইহাও লক্ষ্য করা যায় যে— ‘ক্যাডার’ভিত্তিক প্রশাসন চালাইতে গিয়া রাষ্ট্রের প্রচলিত বিধিবিধানের প্রতিও অবজ্ঞা দেখানো হয়। ইহা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পৃষ্ঠপোষকতা বা মৌন সম্মতি ব্যতিরেকে সম্ভব নহে।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, উন্নয়নশীল বিশ্বে সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কর্তৃত্বে বা ক্ষমতাবলেই প্রশাসন পরিচালিত হয়। অতএব, তাহারা দলীয় হউক কিংবা ‘ক্যাডার’ই হউক, প্রধান নির্বাহী তাহাদের বিদ্যমান নিয়মকানুন মানিয়া চলিতে বলিতে পারেন কিংবা পারিতেন। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তিনি তাহা না করিয়া বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রশাসনের মধ্যে দ্বন্দ্বাবস্থা তৈরি করিয়া ফেলেন। ফলে প্রশাসন চালাইতে গিয়া কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হইতে হয় সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের। আমরা আগেই বলিয়াছি যে, সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইচ্ছা করিলে একাই প্রশাসন চালাইতে পারেন। কিন্তু তাহা না করিয়া এই সমস্ত উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি করা হয়। এই কন্ট্রাডিকশন বা বৈপরিত্যের ফলে প্রশাসন শ্লথ হইয়া পড়ে। অথচ কোনো অঘটন ঘটিলে কিংবা কোনো লক্ষ্য অর্জিত না হইলে রাজনীতিকদেরই দায়ী করা হয় ব্যতিক্রমহীনভাবে। আমরা সকলেই জানি, রাজনীতিকদের কিছু সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে। এই বাস্তবতার নিরিখে প্রশাসন বা আমলাতন্ত্র সৃষ্টিই করা হইয়াছিল স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে প্রশাসন চালাইবার স্বার্থে। আর স্বচ্ছ প্রশাসন গড়িয়া তুলিতে না পারিলে উন্নয়নশীল বিশ্ব যাহা অর্জন করিতে পারিত—তাহা যে অর্জন করা সম্ভব নহে— এই কথা বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
সাংবিধানিক বিধিবিধানের আওতায় আমলাতন্ত্রকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করা না গেলে এবং তাহাদের নেপথ্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের যে অপসংস্কৃতি চালু রহিয়াছে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে— তাহা বন্ধ না হইলে হিতে বিপরীত হয়। প্রশাসন মুখ থুবড়াইয়া পড়ে। দুঃখের বিষয় হইল, এই সকল দেশে রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে দুর্নীতির মূল বলিয়া চিহ্নিত করা হইলেও কী সুশীল সমাজ কী ট্রান্সপারেন্সিবাদী— কেহই এই দুর্নীতির গভীরে যাইতে চাহেন না। যদি যাইতেন তাহা হইলে নিশ্চিতভাবে দেখিতে পাইতেন— অস্বচ্ছতা আসলে কোথায়। কাহারা রাজনীতিবিদদের মাথায় কাঁঠাল ভাঙিয়া খাইতেছেন—সেইদিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। সময় পার হইয়া যাইতেছে। অনতিবিলম্বে প্রশাসনের হর্তাকর্তাদের আর্থিক অস্বচ্ছতার আসল রূপও যদি জনসমক্ষে তুলিয়া ধরা না হয়, তাহা হইলে যে যত শুভ কামনাই করুক না কেন তাহাতে কোনো ফল হইবে না। বরং যেকোনো সময় দ্বন্দ্ব-সংঘাত মাথাচাড়া দিয়া উঠিলে আশ্চর্য হইবার কিছু থাকিবে না। প্রশাসন ও রাজনীতিকদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করিতে হইবে। নিয়ম-কানুন ও বিধিবিধান মানিয়া চলিতে হইবে উভয়পক্ষকে। জরুরিভিত্তিতে এই ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন উন্নয়নশীল দেশের প্রধান নির্বাহীদের।
