এইভাবে চলিতে পারে না

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০৯

আগ্রাসনের ব্যাপারে কোনো কোনো পরাশক্তি কতখানি মরিয়া হইয়া উঠিতে পারে, তাহার সর্বশেষ উদাহরণ ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি। বেশ কয়েক বত্সর ধরিয়া দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটের মধ্যদিয়া যাইতেছে। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনকে অজুহাত বানাইয়া নূতন সংকটের ত্রাতা হিসাবে ত্রাণ পাঠাইবার ছলে সংকটকে আরো ঘনীভূত করা হইতেছে বলিয়া মনে করিতেছেন অনেক বিশ্লেষক। এমনিতেই মুদ্রাস্ফীতি, খাবার-ওষুধের মতো জরুরি পণ্যের অভাবে ধুঁকিতেছে ভেনিজুয়েলা। গত বত্সরের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলিয়া বিরোধী নেতা জুয়ান গুয়াইদো এবং তাঁর অনুগামীরা প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে মানিতে অস্বীকার করেন। গত জানুয়ারিতে নিজেকেই অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট বলিয়া ঘোষণা করেন গুয়াইদো। রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বে ভেনিজুয়েলার অবস্থা ইতোমধ্যে আরও খারাপ হইতে শুরু করে। এমতাবস্থায় ভেনিজুয়েলায় ত্রাণ পাঠানো লইয়া নূতন জটিলতা দেখা দেয়। মাদুরো মনে করিতেছেন, ত্রাণ পাঠানোর নাম করিয়া ভেনিজুয়েলায় সেনা ঢোকাইতে চাহে আমেরিকা। তিনি সীমান্ত বন্ধের নির্দেশ দেন। এমনকী প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও ছিন্ন করেন মাদুরো।

গত পাঁচ বত্সরে ভেনিজুয়েলার প্রায় তিশ লক্ষ মানুষ দেশত্যাগ করিয়াছে। দেশটির মুদ্রা বলিতে গেলে মূল্যহীন হইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ তেলের মজুত, হীরকসহ নানাবিধ মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলার এই পরিস্থিতিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? আসলে ভেনিজুয়েলার নূতন জামানার প্রয়াত নেতা হুগো শ্যাভেজের আমল হইতেই ভেনিজুয়েলাকে শায়েস্তা করিবার চেষ্টা চলিতেছে। ভেনিজুয়েলার তেলসহ সকল খনিজ সম্পদ বহুজাতিক লুণ্ঠন হইতে রক্ষা করিতে চেষ্টা করিতেছিলেন তিনি। ২০১৩ সালে তাহার মৃত্যুর পর হইতে উত্তরসূরি মাদুরোকেই সামলাইতে হইতেছে সেই বহুজাতিক স্বার্থের দুর্বিষহ চাপ। স্মর্তব্য যে, সেই ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তিতে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হইয়াছিল। কিন্তু বাহিরের শক্তিগুলি ভেনিজুয়েলাকে যেইভাবে বিপর্যস্ত করিতে চাহিতেছে তাহার মধ্যে আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকৃত মর্যাদার প্রতি যেন বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা হইতেছে বারংবার। ভেনিজুয়েলার সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন লইয়া আপত্তির প্রশ্নে আমরা শক্তিমান পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষপাতমূলক অবস্থান দেখিতে পাইতেছি। বিস্ময়ের কথা হইল, ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র লইয়া ইহাদের উত্কণ্ঠার শেষ না থাকিলেও এমন অনেক রাষ্ট্র রহিয়াছে যেখানে গণতন্ত্রের বিন্দুমাত্র অনুশীলন না থাকিলেও তাহাদের সহিত বিপুল উত্সাহে সামরিক ও বাণিজ্যিক উষ্ণ সম্পর্ক বহাল রাখিতে কোনো কথিত আদর্শ বাধা হইয়া দাঁড়ায় না। স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে যে, গণতন্ত্রের কথা বলা বা গণতন্ত্র রফতানি করাটা তাহাদের একটি অজুহাত মাত্র।

ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসে আমরা দেখিয়াছি যে, কথিত উগ্রপন্থি কমিউনিস্টদের তাড়াইতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হইয়াছে। ইহা করিতে গিয়া সংঘটিত হইয়াছে প্রতিবিপ্লব। সুতরাং বিশ্ব মোড়লদের উচিত নিজেদের দেশের নাগরিকদের সমস্যা লইয়াই সীমাবদ্ধ থাকা। স্বাধীন সার্বভৌম্য দেশগুলির জনগণকে নিজেদের ভাগ্য নিজেদের গড়িবার পথে ত্রাতার মুখোশ পরিয়া কাঁটা বিছানোর পরিণতি ভালো হইবে না। এইভাবে চলিতে থাকিলে বিপর্যস্তরা সম্পূর্ণভাবে রুখিয়া দাঁড়াইয়া এই বিশ্বকে নূতন করিয়া পরিচালিত করিতে পারে।