এই ট্র্যাজেডির শেষ কোথায়!

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:১১

গর্ভবতী স্ত্রী নামতে পারেননি; তাই স্বামীও নামেননি! ফলাফল গর্ভের সন্তানসহ স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু, চার বন্ধু আড্ডা দিচ্ছিলেন প্রতিদিনের মতো; চারটি পোড়া মাথার খুলি পড়ে আছে!!

বাবার কাছে সন্তান বিরিয়ানি খেতে চেয়েছে, বাবা বিরিয়ানি নিয়ে ফিরে এসে এখনও পাননি সন্তানকে, জমজ সন্তানদের বয়স এক বত্সরের মতো, মর্গে খুঁজছেন বাবাকে, দুই ভাইয়ের জড়াজড়ি ধরা লাশ আলাদা করা যাচ্ছিল না! আলাদা করার পরে তাদের বুকে শিশুর জড়িয়ে ধরা লাশ পাওয়া যায়, শিশুকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা পর্যন্ত করেছিলেন দুই ভাই, ছেলে নর্থসাউথে পড়ে সন্তানের লাশ চাচ্ছে তার মা; একটু মাংসের দলা হলেও চলবে। তিনি শেষবার বুকে জড়িয়ে ধরবেন, মৃত্যু ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করে বাবাকে ফোন দিয়ে বলছে ভাইয়ের লাশ পাবার কথা।

এমনও অনেক হূদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দিয়েছে চকবাজারে ঘটে যাওয়া মর্মান্তুক অগ্নি ট্রাজেডি। মুহূর্তের দাবানল যে কেড়ে নিয়েছে ফাগুনের সব গল্প। পুড়ে গেছে দেয়াল, পুড়ে গেছে খেয়াল, পুড়ে গেছে কতোই না স্বপ্ন।

ঢাকার চকবাজারের এই নৃশংসতর অগ্নিকাণ্ডের বলি দিতে হয়েছে প্রায় ৮০ জনের মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ এবং শতাধিক গুরুতর আহতের মধ্য দিয়ে। কবে আমরা এরকম মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে  নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারবো!!

আজ থেকে নয় বছর আগে ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক কারখানায় একই ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিলো এবং সে অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়ে ছিলেন। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা এখনও পুরান ঢাকার মানুষ ভুলতে পারেননি। আর মানুষ যখন নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে ব্যবসায়সহ অপরাপর বিষয়কে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে তখন এ রকম ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক।

চকবাজারের দুর্ঘটনার পর বর্তমান মন্ত্রী-নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন, নিমতলীর বিপর্যয়ের পরও সেই সময়ের মন্ত্রী-নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রায় একই কথা বলেছিলেন কিন্তু তার কোনো কিছুই কার্যকর হয়নি বললেই চলে।

সে ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা করা উচিত ছিলো। তাহলে হয়তো দেশের মানুষ এ রকম দ্বিতীয় ট্রাজেডির সম্মুখীন হতো না।

আমরা জানি যে পুরান ঢাকার বেশির ভাগ ভবনই নির্মিত হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে এবং নির্মাণ আইন বা ভবন কোড না মেনে। তাই এগুলো অরক্ষিত এবং অনিরাপদ। রাস্তা থেকে ভবন কিংবা দুই ভবনের মাঝে যেটুকু খালি জায়গা রাখার কথা, তা-ও রাখা হয়নি। এছাড়া চকবাজার এলাকার প্রায় সব সড়কই সরু, অথচ সেসব সড়কের দুই পাশে একের পর এক উঁচু ভবন নির্মিত হচ্ছে। আগুন লাগলে যে তাড়াতাড়ি ফায়ার সার্ভিস আসবে তাও সম্ভব হচ্ছে না এসব সরু রাস্তার কারণে। এক ভবনের গায়ে লাগা আরেকটি ভবন। এরই মধ্যে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন, গ্যাসের লাইন, ওয়াসার লাইন। আর এসব ভবনের নিচতলা, দোতলায় রাসায়নিক পদার্থের গুদাম। যেগুলো একেবারেই দাহ্য পদার্থ। তার পাশেই মানুষের বসবাস। সব মিলিয়ে একটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ বিদ্যমান থেকেই যাচ্ছে।

এ অবস্থার অবসান ঘটাতে এবং পুরান ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী ও ঝুঁকিমুক্ত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ এখনই নেওয়া উচিত। পুরান ঢাকা শুধু কেমিক্যাল জাতীয় কারখানারই অনুপযোগী নয় বরং সব ধরনের কারখানার অনুপযোগী, তাই এগুলো এখান থেকে যতো দ্রুত সম্ভব সরিয়ে নেওয়াটা সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় কারখানাগুলো কোথায় এবং কীভাবে সরিয়ে নেওয়া হবে?

এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে এসব দাহ্য পদার্থ বিক্রি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা শিল্পাঞ্চল করে দেওয়া, যেমনটা করা হয়েছিলো হাজারিবাগের ট্যানারি শিল্পগুলোর ক্ষেত্রে এবং তাদের জন্য সাভারে আলাদা জায়গা করে দেওয়া হয়েছিলো। যদিও তারা সহজে যেতে চায়নি কিন্তু বিভিন্ন কৌশলে তাদের সরানো হয়েছিলো।

পুরান ঢাকার ক্ষেত্রেও সরকার এদের জন্য আলাদা জায়গা করে দিতে পারে এবং সেখানে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠতে সব ধরনের সহায়তা দিতে পারে।

এছাড়াও সরকার, সংশ্লিষ্ট এলাকায় আধুনিক উন্নতমানের অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখা, রাসায়নিক ও অ্যাসিড জাতীয় দাহ্য পদার্থ বিক্রির দোকান ও বিক্রির সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক থাকা, ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের বিস্তার রোধে ওয়াসার লাইনে ফায়ার সার্ভিসের জন্য হাইড্রেন্ট পয়েন্ট রাখা, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা রোধে প্রতি মাসে অন্তত একবার করে হলেও ট্রান্সফর্মারসহ সরেজমিনে পরীক্ষা করা, আর সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি গুরুত্বের দাবি রাখে সেটি হলো মানুষকে সচেতন হতে হবে। নিজের জীবনকে কিভাবে ঝুঁকিমুক্ত করা যায় সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ আমাদের নিজেদের জীবনের চেয়ে কোন কিছুই মূল্যবান নয়।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়