সমপ্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ‘এশিয়া প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক ২০১৮’শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে। এই প্রতিবেদনে ২০০০ হইতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের ২৮টি দেশের বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, নিষ্ক্রিয় তরুণের হার, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, কর্মসন্তুষ্টি ইত্যাদি বিষয়ে তুলনামূলক চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে। ইহাতে দেখা যায়, আমাদের তরুণদের বেকারত্বের হার গত সাত বত্সরে বাড়িয়া দ্বিগুণ হইয়াছে। ২০১০ সালে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ছয় দশমিক চার শতাংশ। ২০১৭ সালে তাহা বাড়িয়া হইয়াছে ১২.৮ শতাংশ। বলা হইয়াছে, ২৭.৪ শতাংশ তরুণ নিষ্ক্রিয়। তাহারা পড়ালেখা, প্রশিক্ষণ বা কোনো কাজেই সক্রিয় নহে। এখানে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের হার কয়েকগুণ বেশি।
অবশ্য তরুণদের বেকারত্ব নিয়া আমরা নানা সময়ে নানা রকম তথ্য দেখিতে পাই। ইহা এই কারণে যে, পরিসংখ্যান কখনো শতভাগ সঠিক হয় না। আবার অনেক সময় মানদণ্ড নির্ধারণে হেরফের হওয়ার কারণেও পরিসংখ্যানে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিতে পারে। যেমন- আইএলও-এর মানদণ্ড হইল— সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করিলেও একজন ব্যক্তি আর বেকারের তালিকায় থাকেন না। কিন্তু আমরা যদি এমন ব্যক্তিকেও বেকার সাব্যস্ত করি, তাহা হইলে বেকারত্বের হারেও বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত হইবে। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হইল, দেশে উচ্চশিক্ষিতদের মাঝে বেকারত্বের হার বাড়িতেছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক চাকুরীর পরীক্ষায় হাজার হাজার চাকুরীপ্রার্থীর অংশগ্রহণই তাহার প্রমাণ। তবে এই কথাও সত্য যে, তাহাদের অনেকে টিউশনিসহ অনলাইনভিত্তিক নানা কাজ করিতেছেন। কিন্তু তাহারা নিজেদের কর্মজীবী বলিয়া স্বীকার করেন না। শুধু ঢাকা নহে, ঢাকার বাহিরেও অনেক তরুণ-তরুণী ছোট-খাট নানা কাজে জড়িত। কিন্তু তাহাদেরও অনেকে নিজেকে বেকার ভাবেন। আসলে তাহারা আনুষ্ঠানিক খাতের চাকুরী-বাকুরীকেই অধিক গুরুত্ব দেন। কেননা অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান টেকসই উন্নয়ন ও উন্নত জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা দেয় না। এইজন্য উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব দূর করিতে হইলে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে হইবে। গুরুত্ব দিতে হইবে শিল্পায়ন ও দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকে।
আইএলও’র প্রতিবেদন অনুযায়ী আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্বের হার যথাক্রমে ৩.৫ ও ৮.৫ শতাংশ হইলেও উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে এই হার ১০.৭ শতাংশ। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, অধিক লেখাপড়া করাটাই যেন অপরাধ। এই পরিস্থিতি হতাশাজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের অন্যতম যে কারণগুলি আছে, তাহা হইল— শিক্ষার মানের অবনতি, কারিগরি শিক্ষায় পশ্চাত্পদতা, অদক্ষতা, ঔপনিবেশিক মন-মানসিকতার প্রভাব ইত্যাদি। এই কারণে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে এই ব্যাপারে আমাদের অবস্থান দ্বিতীয়। আমরা তরুণ জনসংখ্যাকে আমাদের অর্থনীতির জন্য শুভ মনে করি, কিন্তু তাহাদের হস্তে তাহাদের পছন্দসই কাজ তুলিয়া দিতে পারিতেছি না যাহা খুবই দুঃখজনক। কেহ কেহ এই প্রশ্নও তুলিতেছেন যে, জিডিপি ক্রমাগতভাবে বাড়িলেও এবং বিভিন্ন উন্নয়ন দৃশ্যমান হইলেও তরুণদের কর্মসংস্থান কেন বাড়িতেছে না? এই যৌক্তিক প্রশ্নের উত্তর ও আসল গলদটা কোথায় তাহা আমাদের অবশ্যই খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। এইজন্য গ্রহণ করিতে হইবে সমন্বিত নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যাহাতে লেখাপড়া শিখিয়া কেহ আর বেকার না থাকেন।
