ফুল আর কান্নায় নিহতদের স্মরণ

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ০০:৫০

বাবার কবরে এক গুচ্ছ ফুল দিয়েই কেঁদে উঠলো তাহসিন বিন রহমান রামী (১৪)। বুকে জমে থাকা কষ্ট যেন কান্না হয়ে বের হচ্ছিলো তার। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাদি কোহিনুর রহমান বুকে জড়িয়ে ধরলেন নাতিকে। এক পর্যায়ে চিত্কার করে কাঁদতে শুরু করলো রামী।

ছয় বছর আগে এই দিন সকালে তার বাবা মেজর মিজানুর রহমান বাসা থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। সকালে দরবার হলে বৈঠকে অংশ নেবেন। এর কিছু সময় পর দাদির কাছ থেকে শুনতে পান যে দরবার হলে গোলাগুলি হচ্ছে। দুদিন পর বাবার লাশ পায় রামী। রামী এখন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র। পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবসের ৬ষ্ঠ বর্ষপূর্তির এই দিনে বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে রামীর শুধু বাবার কথা মনে পড়ছে। বাবা তাকে প্রায়ই বলতেন, ‘দেশ গড়তে হলে সত্ ও নির্ভীক সৈনিক হতে হবে।’ অথচ সেই নির্ভীক সৈনিক হয়েই কেন তার বাবাকে প্রাণ দিতে হলো? এই প্রশ্নের কোনো  উত্তর খুঁজে পায় না রামী ।
গতকাল বুধবার পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবসে বনানী সামরিক কবরস্থানে নিহত ৫৭ সামরিক কর্মকর্তার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। শহীদ মেজর রফিকুল ইসলামের স্ত্রী সানজানা সোনিয়া জোবায়দা বলেন, ‘আমার স্বামীকে কি কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবেন? ও (স্বামী) মারা যাওয়ার আট মাস পর আমার প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। এই ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে এখন আমি কী করবো। আমার ছেলে মাঝে মধ্যেই বলে, আব্বু কোথায়? আমি কী জবাব দেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার একটাই চাওয়া: ?শুধুমাত্র বিদ্রোহীদের নয়, এর নেপথ্যে যারা ছিলো তাদেরও যেন বিচার হয়। শুধু বিচারের রায় ঘোষণা নয়, রায় কার্যকরও দ্রুত করতে হবে।’
ঘটনার বিবরণ দিয়ে মেজর মিজানুর রহমানের মা কোহিনুর রহমান জানান, বড় আশা নিয়ে ছেলেকে দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে। দেশ গড়ার কাজে বলীয়ান হয়ে নিজের ও পরিবারের গৌরব বয়ে আনবে। কিন্তু আকস্মিক ঝড় শেষ করে দিয়েছে তার সেই স্বপ্ন। বাবার কবর জিয়ারত করতে আসা রামী ও ফারদিন রহমান সামীকে (৮) দেখিয়ে কোহিনুর কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ঘটনার ৯ মাস আগে মিজানের স্ত্রী দুরারোগ্য ব্রেইন ক্যান্সারের কাছে হার মেনে আমাদের ছেড়ে যায়। এরপর এই দুই ছেলে তাদের বাবাকেও হারায়।’
এর আগে সকাল ৯টায় রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বীর বিক্রম শ্রদ্ধা জানান। এরপর নিহত সেনা সদস্যদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে সিনিয়র স্বরাষ্ট্র সচিব মো. মোজাম্মেল হক খান, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, নৌ-বাহিনীর প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল এম ফরিদ হাবিব, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদদের সম্মানে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয় এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এরপর শ্রদ্ধা জানান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরশাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর নিহতদের স্বজন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শ্রদ্ধা জানান। সেখানে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা কবর জিয়ারত করেন। ছয় বছর পরও সেই বিভীষিকার ঘটনার কথা মনে করে এ সময় অনেকে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকেন।
এদিকে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদ ব্যক্তিবর্গের রুহের মাগফিরাত কামনায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ—বিজিবির সকল রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় গতকাল বাদ ফজর খতমে কোরআন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল সকালে সামরিক কবরস্থানে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনোরেল (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, লে. কর্নেল (অব.) আবদুল লতিফ প্রমুখ।