প্রতিবন্ধীদের চাকরি মেলা ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৪২

কর্মক্ষম প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দুদিনব্যাপী চাকরি মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সম্প্রতি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। বাংলাদেশ আজ নানা দিক দিয়ে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করলেও, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী অনেকাংশেই তা থেকে বঞ্চিত এবং নানা ক্ষেত্রে তারা অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার। সমাজের চোখে তারা করুণার পাত্র। অন্যের দয়া ও দানের উপর নির্ভরশীলতার এক প্রতিরূপ যেন প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী। অথচ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজেরই একটি অংশ। এই উল্লেখযোগ্য অংশকে বাদ দিয়ে একটি সমাজ বা দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সমাজের অন্য সব সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো একজন প্রতিবন্ধীরও বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা যায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতি আমাদের অজ্ঞতা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি কারণে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক তথা সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব খুবই নগণ্য। তবে দিনে দিনে এ ধারণাটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তাদের দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষমতায়ন সম্ভব। এ জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তথা স্বাবলম্বিতা। আর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য প্রয়োজন কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যোগ্যতা থাকা সত্বেও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিবন্ধীদের নিয়োগদানের ক্ষেত্রে একেবারেই আগ্রহী নয়। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে যে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা যাবে না।

এ কথা স্বীকার্য যে, পৃথিবীতে কোনো মানুষই পরিপূর্ণ নয়। প্রতিটি মানুষের মাঝেই কোনো না কোনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অথচ একজন সুস্থ স্বাভাবিক ব্যক্তি যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য একজন প্রতিবন্ধী সচরাচর তা পায় না। ফলে প্রতিবন্ধীরা নিজের সীমাবদ্ধতা  জয় করে কর্মসংস্থানের উপযোগী হয়ে উঠতে পারেন না। একজন ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ এবং দক্ষ ও যোগ্য হয়ে ওঠার জন্য শিক্ষা অপরিহার্য। অথচ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিবার বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজে শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলশ্রুতিতে  অনেকেই কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভের প্রতিযোগিতা থেকে আগেই ছিটকে পড়তে বাধ্য হয় এবং পরিবারের বোঝা হয়ে কোনোরকমে জীবন ধারণ করা ছাড়া তার অন্য কোনো বিকল্প থাকে না। কাজেই প্রতিবন্ধীদের কর্মোপযোগী করে গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ একান্ত প্রয়োজন।

মনে রাখতে হবে যে, কিছু প্রতিবন্ধিতা ব্যতীত সকল প্রতিবন্ধীর মাঝেই কোনো না কোনো মেধা, যোগ্যতা ও সামর্থ্য রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও বেশি মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম। অথচ এক্ষেত্রে তার যতটা না সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে তার চেয়ে বেশি সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে রেখেছে তার প্রতিবন্ধিত্বের তিলক। তবে একথাও সত্য যে, সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিই সকল কাজের উপযুক্ত নয়। যদিও একথা অন্যদের অর্থাত্ একজন সুস্থ স্বাভাবিক ব্যক্তির ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। তাছাড়া আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেভাবে কর্ম সম্পাদন করা হয় তার বেশিরভাগ একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য উপযোগী নয়। এক্ষেত্রে শুধু কাজ নয়, বরং কাজের পরিবেশ, সহকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি, অবকাঠামোগত অসুবিধাসহ নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যে কারণে শুধু প্রতিবন্ধিত্ব নয়, পাশাপাশি  উপযোগী কাজ ও অনুকূল কর্মপরিবেশের অভাবও তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  অতএব এ বিষয়গুলো প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের জন্য বিবেচনায় নেওয়া উচিত্।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও সম্প্রসারণের জন্য নিয়োগদান কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা অনেক ক্ষেত্রেই চাকরিদাতাগণ মনে করেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাত্রই অক্ষম ব্যক্তি। ফলে তারা নিয়োগদানের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাদের সক্ষমতাকে নয়। অথচ অন্যদের ক্ষেত্রে ঠিক তার বিপরীত চিত্র আমরা লক্ষ্য করি। কাজেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যোগ্যতা, সামর্থ্য সম্পর্কে  সচেতনতা বৃদ্ধি  করে নিয়োগকর্তাদের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

n লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়