সাঙ্গ হলো প্রাণের মেলা, মিলনমেলা

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৫, ১১:২৪

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার আয়োজন এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। আগামীতে এই নতুন বিন্যাসকে ধরে রেখে বইমেলাকে আরো সুন্দর ও দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী করে আয়োজনের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে পর্দা নামলো মাসব্যাপী এ বইমেলার।

শেষ হলো বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। ভাষা আন্দোলনের অমর স্মৃতিকে স্মরণ করতে এবং সারাদেশে বাংলা ভাষার সৃজনশীল ধারাকে ছড়িয়ে দিতে বাংলা একাডেমি নিয়মিতভাবে আয়োজন করে আসছে এ মেলার। গতকাল মাসব্যাপী মেলা শেষ হলো। মাসব্যাপী লেখক-পাঠক-ক্রেতা-প্রকাশকের পদচারণায় মুখরিত ছিল বাংলা একাডেমির এই মেলা প্রাঙ্গণ। আগামী বছর আবারো এ মেলা নতুন নতুন প্রকাশনা নিয়ে ফিরে আসবে। মেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। লেখক প্রকাশকরা তাদের নতুন নতুন প্রকাশনী নিয়ে হাজির হয়েছিলেন পাঠকের সামনে। গতকাল শেষদিনে মেলায় বসেছিল শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার তাড়াহুড়া। মেলার সময় ফুরিয়ে যাবার পরও স্টলগুলোকে ঘিরে পাঠকদের ভিড় জমেছিল।
শেষদিন উপলক্ষে বাংলা একাডেমির পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, সকাল ১১টায় খুলে যায় মেলার দ্বার। এরপর থেকেই বইপ্রেমীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন মেলার দুই প্রাঙ্গণেই। বিকালের পর সেই ভিড় পরিণত হয় জনসমুদ্রে। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে করে সকলে ঘুরে দেখেছেন শেষদিনের মেলা। ঘরে ফেরার পথে সঙ্গী করে নিয়ে গেছেন নতুন বই।
শনিবার মেলা মঞ্চে ছিল সমাপনী আয়োজন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব রণজিত্ কুমার বিশ্বাস। এর আগে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। মেলা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন মেলা কমিটির সদস্যসচিব ড. জালাল আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস প্রফেসর আনিসুজ্জামান। এবার প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চায় অবদানের জন্য সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার পেয়েছেন ইকবাল হাসান ও সৈয়দ ইকবাল। চিত্তরঞ্জন সাহা পুরস্কার পেয়েছে মাওলা ব্রাদার্স। শহিদ মুনীর চৌধুরী   স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লিমিটেড ও পাঠক সমাবেশ। রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই) স্মৃতি পুরস্কার সময় প্রকাশন। চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল), প্রথমা ও জার্নিম্যান। সমাপনী আয়োজনে এইসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আসাদুজ্জামান নূর।
এ বছর নতুন বই এসেছে ৩ হাজার ৭০০টি। প্রকাশের দিক থেকে এগিয়ে আছে কবিতা। প্রবীণ-নবীন কবি মিলিয়ে কবিতা এসেছে ৮৭৭টি, উপন্যাস ৬২৯টি, গল্প ৫৭৪টি। এছাড়া প্রবন্ধ ২০২, ছড়া ১৩৭, গবেষণা ১১৯, শিশুতোষ ৯৪, জীবনী ৯০, ভ্রমণ ৭৪, বিজ্ঞান ৭১, ইতিহাস ৫৪, মুক্তিযুদ্ধ ৫৩, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ৩৩, রম্য/ধাঁধা ৩০, ধর্মীয় ৩০, নাটক ২৯, কম্পিউটার ১৮, অনুবাদ ১২, রচনাবলী ও অভিধান ৭টি করে এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর এসেছে ৩৩টি নতুন বই। মাসজুড়ে নজরুল মঞ্চে মোড়ক উন্মোচন হয় পাঁচ শতাধিক নতুন বইয়ের।
বাংলা একাডেমির সাধারণ জরিপ অনুসারে ২৮ দিনে বিক্রি হয়েছে ২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার। ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুধু বাংলা একাডেমি থেকেই বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার বই। হুুমায়ূনবিহীন দ্বিতীয় মেলা অনুষ্ঠিত হলেও এবারও সর্বোচ্চ বিক্রি তালিকায় ছিল হুমায়ূন আহমেদের পুরনো বইগুলো। মেলার ২৬তম দিনে হুমায়ূন আহমেদের শেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র চিত্রনাট্যটি বই আকারে প্রকাশ করে অন্যপ্রকাশ। বইটি কেনার জন্য শেষ দিনেও প্রচণ্ড ভিড় দেখা গেলো অন্যপ্রকাশের স্টলে। বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বই। এবার আগামী প্রকাশনী থেকে বের হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘আমার পিতা শেখ মুজিব’।
শেষদিনের নতুন বই
শনিবার মেলার শেষ দিনে নতুন ১২৫টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ২১, উপন্যাস ২১, প্রবন্ধ ৮, কবিতা ৩৪, গবেষণা ৩, ছড়া ৩, শিশুসাহিত্য ১, জীবনী ৩, মুক্তিযুদ্ধ ১, নাটক ২, বিজ্ঞান ১, ভ্রমণ ৮, ইতিহাস ৩, স্বাস্থ্য ১, অনুবাদ ১ এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর এসেছে ১৪টি নতুন বই। এছাড়াও মেলার নজরুল মঞ্চে উন্মোচিত হয়েছে ১৫টি বইয়ের মোড়ক।
মেলামঞ্চের আয়োজন
শনিবার মেলার সমাপনী দিনে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘নাট্যকার শম্ভুমিত্র’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিল্প সমালোচক আবুল হাসনাত। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন হাসান ইমাম, মামুনুর রশীদ এবং এস.এম. মহসীন। সভাপতিত্ব করেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার, শাম্মী আখতার, তপন মাহমুদ, ফেরদৌস আরা, অদিতি মহসিন, সুজিত মোস্তফা, তালাত সুলতানা, ফারহানা ফেরদৌসী তানিয়া, সারোয়ার হোসেন এবং পারভীন আক্তার।