বর্তমান পৃথিবীর সকল দেশকেই জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের সকল দেশের ভাবনা-চিন্তার পরিধি কি একইরকম? এর উত্তর হলো, না। বিশ্বের ধনী দেশগুলোর তুলনায় দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই বিষয়টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হচ্ছে। এর কারণ হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দ্বারা প্রতিনিয়ত ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে। ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং চীন বর্তমান বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের দিক দিয়ে সামনের কাতারে রয়েছে। এছাড়া বর্তমান বিশ্বের সর্বোচ্চ পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করছে তাতে পৃথিবীর ক্ষতির পরিমাণ মোটেও সামান্য নয়।
বিশ্বের যে সমস্ত দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের মধ্যে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ অন্যতম। অতীতে বেশ কয়েকবার জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যা মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেসব বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেছেন। প্যারিসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশও। এই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, উন্নত দেশের কার্বন নিঃসরণের হার যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এবং আশা প্রকাশ করে বলা হয়েছিল এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে যে হারে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে। এই চুক্তি বাস্তবায়ন হওয়ার যে কোনো সম্ভাবনা নেই তা ভারত এবং চীনের কার্বন নিঃসরণের হার দেখে উপলব্ধি করা যাচ্ছে।
এবার আমরা আলোচনা করব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ কীভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সংঘটিত দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর এবং প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের কথা মনে আছে? আমাদের কারো আসলে সেই দুঃসহ স্মৃতিকে ভোলার উপায় নেই। সেসময় ঝড়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩০টি জেলা ভয়ানক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আর অর্থনৈতিক ক্ষতি? এর পরিমাণ আনুমানিক ১৬ হাজার কোটি টাকা।
পরিবেশ দূষণের দিক দিয়ে আমরা বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে একটি। দূষণ রোধ করার জন্য সরকার নানা সময়ে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আমাদের নিজেদের অসহযোগিতার কারণে সেগুলো কখনো আলোর মুখ দেখতে সক্ষম হয় না। আমাদের নিজেদের আসলে প্রচুর সমস্যা রয়েছে। গাছপালা কেটে আমরা বনভূমি একেবারে উজাড় করে ফেলছি। অথচ এই গাছই আমাদের বেঁচে থাকার রসদ অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। বলা হয়ে থাকে একটি গাছ কাটলে তদস্থলে দু’টি গাছ লাগানো অপরিহার্য। কিন্তু আমরা কি সেটা করি বা করতে একটুও ইচ্ছুক?
পরিবেশের এই ভয়াবহ বিপর্যয় রোধ করতে হলে প্রথমেই আমাদের প্রচুর সংখ্যক গাছ লাগাতে হবে। আমাদের সবুজের বেষ্টনি তৈরি করতে হবে। একমাত্র গাছই আমাদের এই বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। উপকূলীয় এলাকায় প্রচুর সংখ্যক গাছ লাগাতে হবে। শুধু তাই নয়, আমাদের বাড়ির আঙিনায় সবুজে ভরে ফেলতে হবে। প্রতিটি শহরে যাতে প্রচুর সংখ্যক গাছ লাগানোর ব্যবস্থা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
সভ্যতার অগ্রগতির জন্য শিল্পকারখানা স্থাপন করা অতি জরুরি। তবে এসব কারখানা থেকে যাতে পরিবেশ ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক উপাদান ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। এই পৃথিবী এবং এই প্রকৃতি ও পরিবেশ আমাদের নিজেদের সম্পদ। একে রক্ষা করার জন্য আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমরা নিজেরা যদি এই প্রকৃতিকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা না করি তাহলে আর কে করবে? সবাইকে পরিবেশ দূষণের ফলে যে জলবায়ুর পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে এই ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে। আমাদের সচেতনতা পরিবেশ দূষণের মাত্রা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে।
সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই মাতৃভূমি যাতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। আমরা যদি এই দায়িত্ব সকলে মিলে সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারি তাহলেই হয়ত জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
n লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
