ডুবে যাওয়া নৌযান উদ্ধারে শক্তিশালী জাহাজ নেই

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৫, ০১:১৪

দেশে নৌপথে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটলেও তা উদ্ধারে নেই কোন শক্তিশালী জাহাজ বা নৌযান। যাত্রীবাহী বড় লঞ্চ, ট্রলার, পণ্যবাহী কার্গো ও ফেরি ডুবির দুর্ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। নিমজ্জিত নৌযান উদ্ধারের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র উপর ভরসা করতে পারছেন না নৌযান মালিকরা। সংস্থার উদ্ধারকারী জলযান ‘হামজা’ ও ‘রুস্তুম’ অনেক আগেই যৌবন হারিয়েছে। ঐ দু’টি জাহাজের ক্রেনের উত্তোলন ক্ষমতা ৬০ টন করে। ‘হামজা’ সংগ্রহ করা হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। ‘রুস্তুম’ সংগ্রহ করা হয় ১৯৮৪ সালে।

দীর্ঘ ২৯ বছর পর কোরিয়া থেকে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে আমদানি করা হয় দু’টি উদ্ধারকারী নৌযান। ‘নির্ভীক’ ও ‘প্রত্যয়’ নামের এ নৌযান দু’টির উত্তোলন ক্ষমতা আড়াই’শ টন। প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও নতুন দু’টি উদ্ধারকারী নৌযান নিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছিল নৌযান মালিকসহ সকলের  মাঝে। নতুন দু’টি উদ্ধারকারী জলযানের মিলিতক্ষমতা ৫শ টন হলেও  ‘নির্ভীক’ ও ‘প্রত্যয়’ একযোগে রুস্তম ও হামজার মত উদ্ধার অভিযান চালাতে পারে না। দুর্ঘটনার পর একটি জলযানকেই কাজে লাগানো সম্ভব। অপরটি বসিয়ে রাখা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। গভীর পানি ছাড়া চলতে পারে না ভারি এ জাহাজ দু’টি। বিআইডব্লিউটিএ’র রুস্তুম ও হামজা ৭/৮ ফুট পানিতে চলাচল করতে পারে। ‘নির্ভীক’ ও ‘প্রত্যয়’ চলাচলের জন্য এর দ্বিগুণ গভীরতা প্রয়োজন হয়। যদিও সংস্থার পরিচালক জানান, নির্ভীক ও প্রত্যয় ১০/১২ ফুট পানিতে চলতে পারে।
দু’টি জাহাজ একত্রে অভিযানে না যাওয়ার ব্যাপারে কর্মকর্তারা জানান, নিমজ্জিত নৌযানে ক্রেন যুক্ত করার পর তার সমান ওজন প্রত্যয় ও নির্ভীককে ভাগ করে দিতে হয়। তা না হলে বিকল হওয়ার আশংকা রয়েছে। জাহাজ দু’টি খুবই স্পর্শকাতর হওয়ায় সতর্কতার সাথে অপারেট করতে না পারলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। নিমজ্জিত জাহাজের ভার নির্ণয় করে দু’ভাগে সমান বিভক্ত করা যায় না বলেই প্রত্যয় ও নির্ভীক একত্রে অভিযানে যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত ২২ ফ্রেব্রুয়ারি পদ্মায় ডুবে যাওয়া ‘এমভি মোস্তফাকে’ উদ্ধার করতে নতুন উদ্ধারকারী জলযানকে কাজে লাগানো যায়নি। ঐ লঞ্চটি শেষ পর্যন্ত রুস্তমই উদ্ধার করে। 
নৌযান চালক ও মালিকরা জানান, ১৯৬০-৬৫ সালে ছোট ছোট নৌযান চলাচল করত। তত্কালীন বিবেচনায় ঐ উদ্ধারকারী জাহাজ সংগ্রহ করা  হয়েছিল। এখন বড় বড় রুটগুলোতে বড় বড় লঞ্চ চলাচল করে। কোনটি দোতলা, কোনটি তিনতলা। সহস্রাধিক যাত্রী বহনকারী লঞ্চগুলো এখন ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ছোট উপজেলা শহরেও যাতায়াত করে। লঞ্চগুলির বডি       স্টিলের। ওজন অনেক বেশি। বরিশালেই  একের পর এক বড় বড় জাহাজ নির্মাণ চলছে। ‘সুরভী’ একসময় ছিল দেশের সর্ববৃহত্ জলযান। এরপর সুন্দরবন কোম্পানি দেশের সর্ববৃহত্ যাত্রীবাহী নৌযান নির্মাণ করে। সর্বশেষ দু’বছর পূর্বে সালমা নেভিগেশন কোং ‘কীর্তনখোলা-২’ নামে অত্যাধুনিক বিলাস-বহুল জলযান নির্মাণ করে। একের পর এক এ ধরনের বড় বড় জাহাজ নির্মাণ হলেও তা দুঘর্টনাকবলিত হলে উদ্ধারে নেই কোন উপায়। মাঝারি নৌযান নিমজ্জিত হলেই অধিকাংশ জাহাজকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হয় বিআইডব্লিউটিএকে। তবুও একের পর এক বড় ধরনের নৌযান নির্মাণের অনুমতি দিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা জানান, যে কোন নৌযান নিমজ্জিত হলে ওজন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পানির নিচে দু’একদিন থাকলে নৌ-যানের ওজন আরো অনেক বাড়ে। এ কারণে বড় লঞ্চ দুর্ঘটনার সময় হামজা কিংবা রুস্তুম এককভাবে উদ্ধার করতে পারে না। দু’টি উদ্ধার ইউনিট একত্রিত হয়েও লঞ্চ উদ্ধারে হিমশিম খায়। চাঁদপুরের নিম্নাঞ্চলে অর্থাত্ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নৌপথে উদ্ধার অভিযানে দায়িত্ব পালনকারী হামজা। চাঁদপুরের উপরের অংশে অর্থাত্ দেশের অন্য নৌপথে উদ্ধার অভিযান করে থাকে রুস্তুম। প্রত্যেক জাহাজে দু’জন করে ডুবুরির পদ রয়েছে। এ ছাড়াও নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ডুবুরি দল কাজ করেছে। বিআইডব্লিউটি-এর পর্যাপ্ত ডুবুরি না থাকায় অধিকাংশ দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ থেকে আহত যাত্রীদের উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স থেকে ডুবুরি আনতে হয় বলে হামজা ও রুস্তুমের কমান্ডারদ্বয় জানান। বরিশাল ফায়ার সার্ভিসে ডুবুরি পাওয়া না গেলে খুলনা ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স থেকে ডুবুরিকে তলব করতে হয়। অতিরিক্ত ডুবুরি রাখার পাশাপাশি উদ্ধারকারী জলযানে একাধিক অপারেটর থাকা প্রয়োজন বলে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা মনে করেন। কিন্তু হামজা ও রুস্তুমে ক্রেন অপারেটর আছেন একজন করে। লাইফম্যানও মাত্র একজন করে। উদ্ধারকারী জাহাজে ক্রেন অপারেটর কিংবা লাইফম্যান অসুস্থ হলে পুরো উদ্ধার অভিযান থমকে দাঁড়ায়। ঐ দু’টি পদের অভিজ্ঞ লোক ছাড়া উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কখনোই সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্ট জাহাজের কেউ অসুস্থ কিংবা অনুপস্থিত থাকলে অন্য জাহাজ থেকে লোক ধার করা হয়। উভয় ইউনিট উদ্ধার অভিযান এলে বিপাকে পড়েন হামজা ও রুস্তুম। উদ্ধারকারী দু’টি জাহাজের একটিতেও স্যালভেজ সুপারভাইজার নেই। জাহাজের কমান্ডার এ দায়িত্ব পালন করেন। উদ্ধারকারী জাহাজগুলোতে নেই কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি। পানির নিচে নৌযানের অবস্থান জানতে এখনো ডুবুরি পাঠানো ও রশি টেনে কাজ সম্পন্ন করা হয়। এ কাজে ডুবন্ত জাহাজ চিহ্নিত করতে কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিন পার হয়ে যায়।