‘এই মানুষে আছে রে মন যারে বলে মানুষ রতন’

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৫, ০১:২২

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া লালন আখড়াবাড়িতে গতকাল বুধবার শুরু হয়েছে পাঁচদিনব্যাপী লালন দোল উত্সব। এবার উত্সবের শিরোনাম ‘এই মানুষে আছে রে মন, যারে বলে মানুষ রতন’। জীবিত অবস্থায় ফকির লালন শাহ ছেঁউড়িয়ায় ভক্ত-শিষ্যদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দোল উত্সব পালন করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় তাঁর তিরোধানের পর ভক্ত-শিষ্যরা প্রতিবছর উত্সবের মধ্য দিয়ে দোল পূর্ণিমা উদ্যাপন করে আসছেন।

ছেঁউড়িয়ায় আসা বাউল মহির শাহ বলেন, মহামতি ফকির লালন সাঁইজি ছিলেন একাধারে আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, হাজারো অসাধারণ গানের গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও পথ প্রদর্শক। তাঁর গানের মাধ্যমেই উনিশ শতকে বাউল গান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাকে ‘বাউল সম্রাট’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। ফকির লালন সাঁই মানবতাবাদী যিনি ধর্ম-বর্ণ-গোত্রসহ সকল প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক এই মনোভাব থেকেই তিনি তাঁর গানসমূহ রচনা করেন। তাঁর গানে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন মানবধর্মকে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগে তিনিই বলেছেন ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।
লালন দোল উত্সব উপলক্ষে ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ি এখন কানায় কানায় পূর্ণ সাধু-ভক্তদের পদচারণায়। অনেক সাধু-ভক্ত গতবার লালন শাহর ধামে আসতে না পারায় এবার অনেকেই কয়েকদিন আগেই এসেছেন এখানে। সফেদ লুঙ্গি, পাঞ্জাবি আর শাড়ি পরিহিত হাজারো ভক্তের সমাগমে ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ির চারপাশ শুধু সাদা আর সাদা। আখড়াবাড়ির মূল আঙিনা ও কালীগঙ্গা নদী তীরে ভবের হাটে বসে ভজন-সাধনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বাউল ভক্ত-সাধুরা। হাতে একতারা/দোতারা, খঞ্জনি, তবলা আর হারমোনিয়াম নিয়ে গলা ছেড়ে গাইছেন : পারে লয়ে যাও আমায়/, সাঁই আমার কখন খেলে কোন খেলা/, সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/, জাত গেলো জাত গেলো বলে/, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়/, আপন ঘরের খবর/, আমারে কি রাখবেন গুরু চরণদাসী/, মন তুই করলি একি ইতরপনা/, এই মানুষে সেই মানুষ আছে/, যেখানে সাঁইর বারামখানা/, বাড়ির কাছে আরশিনগর সেথা একঘর পড়শী বসত করে/, ও-যার আপন খবর আপনার হয় না/, দেখ না মন, ঝকমারি এই দুনিয়াদারী/, ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফান্দ পেতে/, সব সৃষ্টি করলো যে জন/, সময় গেলে সাধন হবে না/, আছে আদি মক্কা এই মানবদেহে/, তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে/, এসব দেখি কানার হাট-বাজার/, মিলন হবে কতদিনে/, কে বানাইলো এমন রঙমহলখানা।
গানশেষে সাধুগুরুরা তাদের শিষ্য ভক্তদের গানের মর্মকথা ব্যাখ্যা করে শোনাচ্ছেন। গান পরিবেশনের সময় দর্শক-জনতাও  নেচে-গেয়ে গানের সাথে সাথে তাল দিচ্ছেন। দর্শক-শ্রোতারা কখনো পিনপতন নীরবতায় গান শুনছেন আবার কখনো গানের তালে করতালি মুখর হয়ে  উঠছেন। কলকাতা থেকে আসা অসীম কুমার বললেন, আমি তো লালন শাহর গানের পাগল। প্রতিবছর দোল উত্সবে ছেঁউড়িয়ায় আসি। তিনি বলেন, ফকির লালন শাহর একজন গুরুর কথা আমরা জানি। তিনি সিরাজ সাঁই। সিরাজ সাঁই ছাড়াও শাহর আরও তিনজন গুরু ছিলেন। মহামতি লালন শাহ তাঁর গানে বলেছেন :
‘তিন পাগলে হৈল মেলা নদে এসে/
তোরা কেউ যাসেন ও পাগলের কাছে।’
লালনের মাজারে ঢোকার রাস্তায় পা ফেলতেই লালনের উদাসী গানের সুর কানে আসে। লালন ও তাঁর গানই মাজারে টেনে আনছে মানুষকে। কোন সে উদাসী ডাক? কোনো দাওয়াত নেই, পত্র নেই, তবুও মানুষ ছুটে আসে দলে দলে। ভক্ত-অনুসারীরা এসেই প্রথমে মূল মাজারের ভিতরে চিরনিদ্রায় শায়িত গুরুর প্রতি বিশেষ ভঙ্গিতে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছেন। তাঁরা জাত, কুল, ধর্ম, গোত্র ভুলে একে অপরের সঙ্গে ভবের হাটে ভাবের আদান-প্রদান করছেন। লালনের ধামে আসা বাউল ও লালনভক্ত গতকাল সকালের নাশতা পায়েস ও মুড়ির সেবা গ্রহণ করেন। দুপুরে তারা মরা কালীগঙ্গায় গোসল সেরে মাছ-ভাত ও তিন ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি তরকারি দিয়ে দুপুরের খাবার গ্রহণ করেন।

লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক সেলিক হক বলেন, একাডেমি কর্তৃপক্ষ গতকাল রাত থেকে আগত সাধুদের খাবারের ব্যবস্থা করেছে। তিনদিন খাবারের ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষই করবে। লালন একাডেমির আয়োজনে লালনের মূল মাজারের সামনে মরা কালীগঙ্গা নদীর তীরে বসেছে লালনমেলা।