নেলসন শহরে তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে।
স্কটল্যান্ডের রান পাহাড় বেয়ে বেয়ে উঠছেন তামিম ইকবাল ও মাহমুদউল্লাহ। সূর্যের আলোটা এসে পড়ছিল ঠিক মাশরাফি বিন মুর্তজার চোখে। বাম হাতটা দিয়ে আলো আড়াল করে, ভ্রূ কুঁচকে যেভাবে চেয়েছিলেন, হঠাত্ দেখে মনে হচ্ছিল—দুশ্চিন্তায় বয়সটা তার একটু বেড়েই গেছে।
না, শেষ পর্যন্ত এই ভ্রূ’র ভাঁজ মিলিয়ে গেছে, তারুণ্য ফিরে এসেছে; ম্যাচ শেষে হাসতে হাসতে সতীর্থদের বুকে জড়িয়ে ধরে মাশরাফি বুঝিয়ে দিয়েছেন—বুক থেকে তার অযাচিত এক পাষাণ ভার নেমে গেছে।
বাংলাদেশ নিজেদের রেকর্ড ও বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া করার রেকর্ড করে হারিয়ে দিয়েছে স্কটল্যান্ডকে। আর কোনো অঘটন বা কেলেঙ্কারিকে আশেপাশে আসতে দেয়নি মাশরাফির দল।
ম্যাচ শেষে দলের এই পারফরম্যান্সে, বিশেষত ব্যাটসম্যানদের চারিত্রিক দৃঢ়তায় দারুণ সন্তোষ প্রকাশ করলেন অধিনায়ক মাশরাফি। সেই সঙ্গে নিজেদের বোলিং নিয়ে যথেষ্ট অসন্তুষ্টিই প্রকাশ করলেন। তবে সব কথার এক কথা হিসেবে বললেন—জয় এসেছে, এটাই তার সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টি।
ম্যাচ নিয়ে যে বোলারদের কারণে দারুণ একটা দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন, সেটা অস্বীকার করার কোনো চেষ্টাই করলেন না মাশরাফি, ‘একটা সময় খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিলো। সেটা সত্যি কথা। এক সময় মনে হচ্ছিল, ভুল করে ফেলেছি কি না। আমরা অতিরিক্ত একটা স্পিনার নিতে পারতাম। সেটা না করে একটা অতিরিক্ত ব্যাটসম্যান নিয়ে ঝুঁকি নিয়ে খেলেছি। ম্যাচের আগের দিন যখন উইকেটে দেড় ইঞ্চির মতো ঘাস দেখা গিয়েছিলো, তখন আমরা দ্বিধায় ছিলাম। এরপর বোলাররা আসলেই ভালো বল করতে পারেনি। ফলে দুশ্চিন্তা তো ছিলই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা ম্যাচ জিতেছি। ফলে এটাই এখন আমাদের সবচেয়ে খুশির ব্যাপার।’
মাশরাফিকে এই খুশি করার কাজটা মূলত ব্যাটসম্যানরাই করেছেন। তামিমের ৯৫ রানের ইনিংস এবং মাহমুদউল্লাহ, সাকিব, মুশফিকের ফিফটিতে শেষ হাসিটা মাশরাফিরা হাসতে পেরেছেন। তাই জয়ের প্রসঙ্গটা যখন এলো মাশরাফি একেবারে আলাদা আলাদা করে ব্যাটসম্যানদের ধন্যবাদ না দিয়ে পারলেন না, ‘তিনশো রান চেজ করে জেতাটা খুবই কঠিন। বিশেষ করে বিশ্বকাপে ম্যাচে। আজ আমি দেখেছি ব্যাটসম্যানরা খুব ইতিবাচক ছিলো। শুরু থেকেই তারা খুব ভালো খেলেছে। সব চেয়ে বড় ব্যাপার হলো তারা মাঠে খুব ঠাণ্ডা মাথায় খেলেছে। বিশেষ ভাবে তামিমকে ধন্যবাদ দিতে হয়। বিজয় ব্যাটিং করতে পারবে না জানার পর সে আরও বেশি দায়িত্ব নিয়ে ব্যাট করেছে। প্রথম দুই ম্যাচে ও রান করতে পারেনি। এ কারণে আমারও খুব খারাপ লেগেছে। এই ম্যাচে ভালোভাবে কামব্যাক করেছে। ও নিজে অনেক চেষ্টা করেছে বলেই আজ এখানে আসতে পেরেছে। রান করতে হলে কিছুটা ভাগ্যও লাগে। রিয়াদও খুব ভালো ব্যাটিং করেছে। ও সাধারণ তিন নম্বরে ব্যাটিং করে না। আজ সেখানে নেমে ভালো করেছে। মুশফিক-সাকিব আগের ম্যাচে রান করেছে। তারা ফর্মেই ছিলো। যার কারণে ওদের জন্য কাজটা খুব কঠিন ছিলো না। রুম্মনও ভালো করেছে। আমি বিশেষ ভাবে ব্যাটসম্যানদের ধন্যবাদ দিতে চাই। এত বড় একটা রান তারা ঠাণ্ডা মাথায় চেজ করেছে।’
ব্যাটসম্যানদের এই স্তুতির পাশাপাশি মাশরাফিকে গ্রাস করেছে প্রথম ম্যাচে দারুণ ঝলসানো বেন বোলিংয়ের টানা ব্যর্থতা। যদিও তাসকিন তিনটি উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু সবমিলিয়ে অসন্তুষ্টি লুকানোর জায়গা দেখছেন না, ‘আমাদের বল হাতে আরো অনেক ভালো করা সম্ভব। যেটা তিনশো আঠারো রান হয়ে গেছে, সেটাকে দুইশো আশিতে আটকানো সম্ভব ছিলো। সেটা আমি বিশ্বাস করি। এই ধরনের উইকেটে তিনশো রান হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বোলারদের খেয়াল রাখতে হবে দুইশো আশির উপরে যেন না যায়। উইকেট দেখে আমাদেরকে আলোচনা করতে হবে। আসলে আমাদেরকে এই বোলিং নিয়েই খেলতে হবে। ফলে এদেরই উন্নতি করতে হবে।’
শেষ পর্যন্ত বোলার বা ব্যাটসম্যান; যার কৃতিত্বেই হোক, জয় এসেছে।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয়টার একটা বড় দরকার ছিলো সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের পার্থক্যটা প্রমাণ করা। এই জয়টা না পেলে আবার সেই কথাটা উঠে যেত। আপাতত সেই প্রমাণ করার কাজটা খুব ভালোভাবেই করতে পেরেছে মাশরাফির দল। তবে মাশরাফি এই প্রমাণের ব্যাপারটাকে খুব একটা পাত্তা দিতে চান না, ‘আসলে প্রমাণ করার তো শেষ নেই। আমরা জানি, যে আমরা আফগানিস্তান-স্কটল্যান্ডের চেয়ে ভালো দল। এখন আসলে কে কোনটা মনে করে, সেটা বলা কঠিন। তবে আমার কাছে সব সময়ই মনে হয়েছে আমরা এদের থেকে ভালো দল। হয়তো আমরা কখনও হেরে গিয়েছি। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা সব সময় ভালো দল। একটা দুটো জয় দিয়ে সেটা প্রমাণ করা যায় না, আবার একটা দুটো পরাজয়ে সেটা বদলেও যায় না।’
স্কোরকার্ড
স্কটল্যান্ড রান বল ৪ ৬
কোয়েটজার ক সৌম্য ব নাসির ১৫৬ ১৩৪ ১৭ ৪
ম্যাকলিও ক মাহমুদুল্লাহ ব মাশরাফি ১১ ১১ ২ ০
গ্রাডিনার ক সৌম্য ব তাসকিন ১৯ ৩২ ৩ ০
মাচান ক এন্ড ব সাব্বির রহমান ৩৫ ৫০ ২ ১
মমসেন ক সৌম্য ব নাসির ৩৯ ৩৮ ২ ১
বেরিংটন ক মুশফিক ব তাসকিন ২৬ ১৬ ১ ২
ম্যাথু ক্রস ক সাব্বির ব তাসকিন ২০ ১৪ ১ ১
জস ডেভি নট আউট ৪ ৩ ০ ০
মজিদ ক সৌম্য ব সাকিব আল হাসান ১ ৩ ০ ০
ইভানস নট আউট ০ ০ ০ ০
অতিরিক্ত (লেগবাই ১, ওয়াইড ৫, নোবল ১) ৭
মোট (আট উইকেট; ৫০ ওভার) ৩১৮
উইকেট পতন
১/১৩ (ম্যাকলিও, ২.২), ২/৩৮ (গ্রাডিনার, ৯.৫), ৩/১১৬ (মাচান, ২৩.৬), ৪/২৫৭ (মমসেন, ৪২.৫), ৫/২৬৯ (কোয়েটজার, ৪৪.৪), ৬/৩০৮ (বেরিংটন, ৪৮.৩), ৭/৩১২ (ম্যাথু ক্রস, ৪৮.৬), ৮/৩১৫ (মজিদ হক, ৪৯.৫)।
বোলিং: মাশরাফি ৮-০-৬০-১, সাকিব ১০-০-৪৬-১, তাসকিন ৭-০-৪৩-৩, রুবেল ৮-০-৬০-০, মাহমুদুল্লাহ ৫-০-২৯-০, সাব্বির ৭-০-৪৭-১, নাসির ৫-০-৩২-২।
বাংলাদেশ রান বল ৪ ৬
তামিম ইকবাল এলবিডব্লিউ ব ডেভি ৯৫ ১০০ ৯ ১
সৌম্য সরকার ক ক্রস ব ডেভি ২ ৫ ০ ০
মাহমুদুল্লাহ ব ওয়ার্ডল ৬২ ৬২ ৬ ১
মুশফিকুর রহিম ক ম্যাকলিড ব ইভানস ৬০ ৪২ ৬ ২
সাকিব আল হাসান নট আউট ৫২ ৪১ ৫ ১
সাব্বির রহমান নট আউট ৪২ ৪০ ৪ ২
অতিরিক্ত (ওয়াইড ৮, নোবল ১) ৯
মোট (চার উইকেট; ৪৮.১ ওভার) ৩২২
উইকেট পতন: ১/৫ (সৌম্য সরকার, ১.৫), ২/১৪৪ (মাহমুদুল্লাহ, ২৩.৩), ৩/২০১ (তামিম ইকবাল, ৩১.৩), ৪/২৪৭ (মুশফিকুর রহিম, ৩৭.৬)।
বোলিং: ওয়ার্ডল ৯.১-০-৭৫-১, ডেভি ১০-০-৬৮-২, ইভানস ১০-১-৬৭-১, মাচান ৭-০-৪৫-০, মজিদ হক ১০-০-৪৯-০, বেরিংটন ২-০-১৮-০।
বাংলাদেশের সেরা রান তাড়া
রান প্রতিপক্ষ ভেন্যু সাল
৩২২/৪ স্কটল্যান্ড নেলসন ২০১৫
৩১৩/৬ জিম্বাবুয়ে বুলাওয়ে ২০০৯
৩০৯/৬ নিউজিল্যান্ড ফতুল্লা ২০১৩
বিশ্বকাপের সেরা রান তাড়া
রান জয়ী প্রতিপক্ষ ভেন্যু বিশ্বকাপ
৩২৯/৭ আয়ারল্যান্ড ইংল্যান্ড ব্যাঙ্গালুরু ২০১১
৩২২/৪ বাংলাদেশ স্কটল্যান্ড নেলসন ২০১৫
৩১৩/৭ শ্রীলঙ্কা জিম্বাবুয়ে প্লাইমাউথ ১৯৯২
বিশ্বকাপের বাংলাদেশের ব্যক্তিগত সেরা
রান ব্যাটসম্যান প্রতিপক্ষ ভেন্যু বিশ্বকাপ
৯৫ তামিম ইকবাল স্কটল্যান্ড নেলসন ২০১৫
৮৭ মোহাম্মদ আশরাফুল দক্ষিণ আফ্রিকা প্রুভিডেন্স ২০০৭
৭৩* ইমরুল কায়েস নেদারল্যান্ডস চট্টগ্রাম ২০১১
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের দলীয় সর্বোচ্চ
রান প্রতিপক্ষ ভেন্যু সাল
৩২২/৪ স্কটল্যান্ড নেলসন ২০১৫
২৮৩/৯ ভারত ঢাকা ২০১১
২৬৭/১০ আফগানিস্তান ক্যানবেরা ২০১৫
