দেশব্যাপী আয়কর মেলার শেষ দিনে গতকাল মেলার প্রাঙ্গণে উপচেপড়া ভিড় ছিল করদাতাদের। রাজধানীর বেইলী রোডের অফিসার্স ক্লাবে নির্ধারিত সময় বিকাল ৫টার পরও শত শত করদাতাকে মেলায় ভিড় করতে দেখা গেছে। ফলে পাঁচটার পরও রিটার্ন জমা নিয়েছেন মেলা আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। করদাতাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কর অফিস ও আয়কর মেলার চিত্র পুরো উল্টো। মেলায় যেসব কর্মকর্তা আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দেন, কর অফিসে এর বেশিরভাগ কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীর কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায় না। ক্ষেত্রবিশেষে অসহযোগিতা ও হয়রানির শিকার হতে হয়। তারা চান, কর অফিসেও যাতে আয়কর মেলার মতো সেবা পাওয়া যায়। তাহলে আরও বেশি সংখ্যক করদাতা আয়কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ হবেন বলে তাদের বিশ্বাস।
গতকাল মেলায় শেষ বিকালে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন একটি বেসরকারি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী মাহমুদ ইসলাম ও তার স্ত্রী। গত দুই বছর ধরে আয়কর মেলায়ই কর রিটার্ন জমা দিচ্ছেন তারা। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, রিটার্ন জমা দিতে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে শেষ বিকালে রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
মিরপুর থেকে কর মেলায় এসেছেন অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী আমিনুল ইসলাম। গত ১৬ বছর ধরে তিনি আয়কর দিচ্ছেন। ২০১০ সালে মেলা শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি আয়কর মেলায় রিটার্ন জমা দিচ্ছেন। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, কর অফিসে কেউই সহযোগিতা করতে চান না। বরং কীভাবে আটকে রাখা যায় কিংবা নানান খুঁত ধরে হয়রানি করা যায়, সে চেষ্টাই চলে। কর্মকর্তাদের সঙ্গে তো কথা বলারই সুযোগ পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, আয়কর মেলার মতো এই সেবা কর অফিসে পাওয়া গেলে মানুষ কর দিতে উত্সাহিত হবেন।
করদাতারা জানান, পুরো কর ব্যবস্থাপনাই জটিল। এসব কারণে মানুষ করের আওতায় আসতে চায় না। একবার করের আওতায় আসলেই হয়রানির শুরু।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, এবারের মেলায় রেকর্ডসংখ্যক করদাতা সেবা নিয়েছেন। অন্যদিকে যারা রিটার্ন এখনো জমা দেন নি, তারা চলতি নভেম্বর জুড়েই রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। গতকাল সন্ধ্যায় মেলা শেষে অফিসার্স ক্লাব প্রাঙ্গণে সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এনবিআর সদস্য জিয়াউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া কর মেলায় করদাতাদের উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে আয়কর অফিসগুলোতে করদাতাদের যেন আয়কর মেলার মতোই সেবা প্রদান করা হয়, সেজন্য কর কর্মকর্তাদের আহ্বান জানান।
আগামী ৩০ নভেম্বর জাতীয় আয়কর দিবস হিসেবে পালিত হবে। ওই দিনই আয়কর দেওয়ার শেষ দিন। আগামী ৩০ নভেম্বর আয়কর দিবস পালিত হলেও ওই দিন সরকারি ছুটির দিন। এ জন্য পরবর্তী অফিস খোলার দিন কোনো জরিমানা ছাড়াই করদাতারা আয়কর রিটার্ন জমা ও কর প্রদান করতে পারবেন। এর পর রিটার্ন জমা দেওয়া হলে প্রতিদিনের জন্য পূর্বের বছরের দেওয়া করের ওপর ২ শতাংশ হারে জরিমানা গুনতে হবে।
এবার কর মেলায় সেবা নিলেন
১৬ লাখ ৩৬ হাজার ব্যক্তি
সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলায় ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭৩ করদাতা তাদের আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। গত বছরের মেলায় রিটার্ন দাখিল হয়েছিল ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৪৮৭টি। অর্থাত্ গত বছরের চাইতে এবার মেলায় রিটার্ন দাখিল বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। এবার মেলায় এসে ৩৯ হাজার ৭৪৩ জন্য নতুন করে কর সনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) নেওয়ার মাধ্যমে আয়করের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। গতবার মেলায় নতুন ই-টিআইএন সংগ্রহকারী ছিলেন ২৯ হাজার ২৫৪ জন। এছাড়া এবার মেলায় সেবা গ্রহণকারী ব্যক্তির হিসাবও অতীতের যে কোন সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এবার ১৬ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৬ জন আয়কর মেলায় এসে সেবা নিয়েছে। গত বছরের মেলায় এ সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৬৯ হাজার। সেই বিবেচনায় এবার মেলা থেকে সেবাগ্রহণকারী বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
