বাঘের হুঙ্কারে কাঁপল বিশ্ব

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৫, ১১:১৩
রুবেল হোসেনের বলটা গোলার মতো গিয়ে আঘাত করলো স্ট্যাম্পে। এক সেকেন্ডের জন্য যেন থমকে গেল বিশ্ব। মাশরাফি বিন মুর্তজা দৌড় দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কিন্তু আনন্দ অশ্রু ফেলারও সময় পেলেন না। সতীর্থরা সবাই মাশরাফির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিত্কার করে উঠলেন। চিত্কার করে উঠলো অ্যাডিলেড, চিত্কার করে উঠলো ঢাকা, চিত্কার করে উঠলো চট্টগ্রাম-বরিশাল-সিলেট-রাজশাহী; চিত্কার করে উঠলো আসলে সারা বাংলাদেশ এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি মানুষ।
চিত্কার করে উঠতেই হবে। এ শুধু চিত্কার করার দিন, আনন্দ করার মিছিল করার দিন। কারণ, অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ওভালে শ্বাসবন্ধ করে রাখা ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ১৫ রানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে গেলো বাংলাদেশ দল। ইতিহাসের হাতছানি নিয়ে খেলতে নামা এই ম্যাচে মাহমুদউল্লাহর ইতিহাস গড়া সেঞ্চুরি, রুবেল হোসেনের দানবীয় বোলিংয়ে ভর করে নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের প্রথমপর্ব পার করলো মাশরাফির দল। আর প্রথমবারের মতো পা রাখলো তারা নকআউট পর্বে।
এই ম্যাচ জিতলেই কোয়ার্টার ফাইনাল– এই সমীকরণ মাথায় নিয়েই খেলতে নেমেছিলো বাংলাদেশ।
কিন্তু শুরুটা একেবারেই মনমতো হয়নি। টসে হেরে আগে ব্যাটিং করতে নেমে মাত্র ৮ রানে দুই ওপেনার ইমরুল কায়েস ও তামিম ইকবালকে হারিয়ে ফেললো দল। তখন মনে হচ্ছিল, জয়ের স্বপ্ন দেখা কঠিন ব্যাপার হয়ে উঠবে। এখান থেকেই বাংলাদেশকে প্রথম পথ দেখালেন সৌম্য সরকার ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।
তৃতীয় উইকেটে ৮৬ রানের জুটি করে তারা একটু স্বস্তি ফেরালেন উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে। কিন্তু সৌম্য সরকার এবং উইকেটে এসেই সাকিব আল হাসানের বিদায়ে আবার থরোথরো অবস্থা। সৌম্য ৫২ বলে ৫টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো ৪০ রান করে ফিরে গেলেন। এর পরই মাত্র ২ রান যোগ করে ফিরে গেলেন সাকিবও।
এই অবস্থায় যে শঙ্কা তৈরি হলো আবার, সেটা কাটাতেই বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাটিং জুটি করলেন দুই পরমাত্মীয় ব্যাটসম্যান—রিয়াদ ও মুশফিক। এই দুজন পঞ্চম উইকেটে করেন ১৪১ রান। একইসঙ্গে আগ্রাসী, পাল্টা আক্রমণে ভরপুর এই জুটিই কার্যত বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহের দিকে এগিয়ে নিলো। এই জুটি ভাংলো মাহমুদউল্লাহর বিদায়ে। তার আগেই মাহমুদউল্লাহ অমোচনীয় ইতিহাসে নাম লিখে ফেলেছেন নিজের।
বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হিসাবে বিশ্বকাপে আত্মপ্রকাশ করলেন রিয়াদ। শেষ পর্যন্ত যখন রান বাড়াতে গিয়ে আউট হলেন, তার আগেই নামের পাশে যোগ হয়ে গেছে ১৩৮ বলে ৭টি চার ও দুটি ছক্কায় সাজানো ১০৩ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস।
এই সেঞ্চুরিয়ানের তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলতে পারতেন মুশফিকও। কিন্তু নিজের ইনিংসের মায়া না করে দলের জন্যই ছুটছিলেন মুশফিক। ফলে ছক্কার নেশায় তুলে মারতে গিয়ে আউট হলেন ৭৭ বলে ৮টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো ৮৯ রানের ইনিংস খেলে। তারপর বাংলাদেশকে ২৭৫ রানের চূড়ায় পৌঁছে দিলো সাব্বির, মাশরাফি ও আরাফাত সানির ছোট্ট ছোট্ট তিনটি ইনিংস।
এই রানটা নিতান্ত কম নয়। কিন্তু তাড়া করতে গিয়ে ইংল্যান্ড যেভাবে শুরু করলো, মনে হল তাদের জন্য লক্ষ্যটা সহজই। বিনা উইকেটে ৪৩ রান তুলে ফেলার পর প্রথম উইকেট তারা হারালো রান আউটের ফাঁদে পড়ে। এরপরই ইয়ান বেল ও অ্যালেক্স হেল দলকে ১ উইকেটে ৯৭ রানে পৌঁছে দিলেন। ২ উইকেটে ১২১ রান পর্যন্তও এগিয়েই ছিলো ইংল্যান্ড কিন্তু এরপরই গর্জন করে উঠলেন বাংলাদেশের পেসাররা।
ধরে নেয়া হয়েছিলো অ্যাডিলেডে হিরো হবেন বাংলাদেশের স্পিনাররা। কিন্তু এই জায়গাকেই যেন চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিলেন পেসাররা। মাশরাফি, তাসকিন ও রুবেল নাড়িয়ে দিলেন ইংল্যান্ডের ভিত। সঙ্গে আরেকটি দুরন্ত রানআউট। একপর্যায়ে সবমিলিয়ে ২৩৮ রানে ৮ উইকেট হারায় ইংল্যান্ড। কিন্তু এখান থেকেই আবার ফিরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলো তারা।
স্টুয়ার্ড ব্রডকে নিয়ে একটা শেষ চেষ্টা করছিলেন ওকস। শেষ পর্যন্ত ২ ওভারে দরকার ছিল তাদের ১৬ রান। এমন সময়ই ৪৯তম ওভারে বল করতে এসে প্রথম বলেই ব্রডকে ফেরালেন রুবেল। আর এক বল বিরতি দিয়েই ফেরালেন অ্যান্ডারসনকে। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব জুড়ে বাংলাদেশের উত্সব শুরু হয়ে গেল।