পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, সকল পক্ষ যদি সংবিধানের অধীনে নির্বাচন করতে রাজি হয় তাহলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু সংবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কিংবা সংবিধান উত্পাটন করে কেউ যদি নির্বাচন চায় তাতে যে ক্ষতিকর পরিবেশ-পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে এবং দেশের যে আর্থিক ক্ষতি হবে তা অকল্পনীয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অথবা অন্য কোনো উপায়ে নির্বাচন করার যে দাবি করা হচ্ছে তার পরিবর্তে নির্বাচন কমিশন সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। গতকাল পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, গত দুই-আড়াই মাস ধরে যে সহিংস অবস্থা দেশব্যাপী বিরাজমান তথা ঝগড়া-ফ্যাসাদ চলছে তাতে ১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। ঘটেছে শতাধিক প্রাণহানি। বিদেশি বন্ধুরা যারা আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করে তারা বলে তোমরা গরিব দেশের মানুষ তোমাদের দেশে বিনিয়োগের জন্য স্বাভাবিক পরিবেশ থাকার বদলে যে সব ঘটনা ঘটছে তা অনভিপ্রেত। ওপরতলার ঝগড়া-ফ্যাসাদের মাসুল জনগণকেই দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে দু’চারজনকে দোষারোপ না করে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই জনগণকেই এগিয়ে এসে সোচ্চার হয়ে সংঘবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। জনগণকে নির্লিপ্ত-নিষ্ক্রিয় থাকলে চলবে না।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, দেশের সর্বাধিক সফল ক্ষেত্র হচ্ছে কৃষি। স্বাধীনতা-উত্তরকালে এই দেশে খাদ্য ঘটতি থাকলেও বর্তমানে খাদ্য উদ্বৃত্ত কৃষি খাত রপ্তানি খাতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর দেশের দুই শতাংশ কৃষি জমি নদী ভাঙ্গনসহ বসত বাড়ি তৈরিতে বিনষ্ট হলেও আজ কৃষি উত্পাদন আশাব্যঞ্জক। যার কৃতিত্ব যেমন সরকারের তেমনি আমাদের কৃষক সমাজেরও। আমাদের সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে আরেকটি বাংলাদেশ জেগে উঠছে। এই সম্ভাবনার নতুন খবরের পাশাপাশি দেশের যে আতংক-আশংকা দেখা দিয়েছে তাতে জান বাঁচানোই দায়। তিনি বলেন, আমাদের দেশের নেতারা সব সময় দেশপ্রেমিক বক্তব্য দেন, স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলেন, উত্পাদনের কথা বলেন। অথচ ঝগড়া-ফ্যাসাদ বাধিয়ে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেন যেখানে কাজের উত্সাহ থাকে না। যারা এই ঝগড়া-ফ্যাসাদ বাধান তাদের স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি বিশেষত মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের বড় নেতাদের বোঝান যে, বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনার দেশ। এ দেশের মাটির নিচে গ্যাস আছে, তেল আছে, ইউরেনিয়াম আছে। যার সদ্ব্যবহার করে আমরা বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হতে পারি।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ আধা সামন্তবাদী দেশ। এই অবস্থা তথা আমাদের রাজনৈতিক দর্শনের পরিবর্তন করতে হবে। এভাবে দেশ চলতে পারে না। যদি কাজ করতে দেয়া না হয়, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরা ঠিক মতো কাজ করতে না পারেন তা হলে এক সময় জনগণ তাদের টুঁটি চেপে ধরবে। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সর্বক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা, শান্তিপূর্ণ অবস্থা এবং কাজ করার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা আবশ্যক। আমরা মানুষের জন্য যা করি তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে এত নদী-নালা, খাল-বিল রয়েছে যে সেখানে পরিকল্পিতভাবে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করতে পারলে আরও উন্নয়ন করা সম্ভব ছিল। ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে এ উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, মনে রাখা দরকার সরকারের টাকায় যে রাস্তা-ঘাট করা হয় তা জনগণের ট্যাক্সের টাকা। এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, এ ক্ষেত্রে আত্মসাত্, দুর্নীতি, অপচয় বরদাস্ত করা হবে না। বর্তমান মহাজোট তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশে অতীত ও বর্তমানে যে কাজ করছে তা আমি কখনই দেখিনি। অতীতে শেখ হাসিনা ও এরশাদের মন্ত্রিসভায় দায়িত্বপালন করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি এ কথা বলছি। এই কাজের ধারা অব্যাহত রাখতে মানুষকে শান্তিতে বসবাস করতে দিতে হবে। গণতন্ত্র বজায় এবং রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন্ন রাখতে হবে। সবার মনে রাখা উচিত দেশে যেভাবে কাজের ক্ষতি হচ্ছে আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসতে চান তখনও এ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তাই সকল পক্ষেরই জনগণের কথা বিবেচনা করে দেশপ্রেমিক ভূমিকা তথা দায়িত্বশীল আচরণ বাঞ্ছনীয়। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল দুপুরে কাউখালী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে বিভিন্ন কর্মসূচি উপলক্ষে আয়োজিত যৌথ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আহসান কবির, বন বিভাগের ডিএফও মিজানুর রহমান, কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক মোঃ আবুল হোসেন তালুকদার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট নূরুল হক, উপজেলা জেপির সভাপতি মাহবুবুর রহমান খান, সদর ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রশীদ মিল্টন প্রমুখ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, পিরোজপুরের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ হারুন অর রশীদ, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মিঠু, কৃষি কর্মকর্তা আলী আজিম শরীফ, ইউপি চেয়ারম্যান কৃষ্ণলাল গুহ ও নজরুল ইসলাম বাদশা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন তালুকদার, জেপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহ আলম তালুকদার প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রাপ্ত আর্থিক অনুদানের চেক, পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে সুবিধা বঞ্চিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনুদানের চেক এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন সড়কে সামাজিক বনায়নে উপকারভোগীদের মাঝে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করেন। এর আগে মন্ত্রী পিরোজপুর-গোপালগঞ্জ-বাগেরহাট সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প ও কাউখালী উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে কৃষি ও প্রযুক্তি মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর তিনি মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। মেলায় এ অঞ্চলের কৃষিপণ্য ও উপকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৪টি স্টল রয়েছে।
এরপর পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি কাউখালী উপজেলার হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। এখানে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সের চাবি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন। এ সময় মন্ত্রী এ উপজেলায় হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য সেবার সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ডা. মোঃ ছিদ্দিকুর রহমান। সভায় হাসপাতালে নতুন অ্যাম্বুলেন্স দেয়ার জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া এ হাসপাতালকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করার কাজ শুরুর দাবি জানানো হয়। সকালে মন্ত্রী শিয়ালকাঠি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন সংলগ্ন খালের ওপর এলজিইডি নির্মাণাধীন সেতুর কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন। এ সময় সংক্ষিপ্ত স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশে মন্ত্রী বক্তব্য রাখেন। ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান আবুল বাশারের সভাপতিত্বে এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন কাউখালী উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আহসান কবির ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান পল্টন।
মানুষ হাত গুটিয়ে বসে থাকলে
ভাগ্য পরিবর্তন হবে না
ভাণ্ডারিয়া সংবাদদাতা কে এম ফজলুর রহমান জানান, পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু রাতে ভান্ডারিয়া উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। এখানে তিনি বলেন, যখন আমরা ভাণ্ডারিয়ায় এসে শান্তির কথা, সহযোগিতার কথা, ধৈর্যের কথা বলছি তখন ঢাকায় লঙ্কাকাণ্ড ঘটছে। গত ৬৭ দিনে দেশের ১৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ১৬ কোটি মানুষ যদি এ অবস্থায় হাত গুটিয়ে বসে থাকে তাহলে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। তিনি বলেন, এ এলাকায় ১৯৮৫ সাল থেকে আমরা সম্মিলিতভাবে কিছু করতে সক্ষম হয়েছি। ঢাকা থেকে পাথরঘাটা পর্যন্ত আজ সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। আমরা দক্ষিণাঞ্চলের শিকারপুর দোয়ারিকা সেতু, গাবখান সেতু, বলেশ্বর সেতু, দড়াটানা সেতু, রূপসা সেতু, মোল্লারহাট সেতু নির্মাণ করেছি। ৩০ বছরের রাজনীতিতে এ এলাকার কখনও কাউকে আইন হাতে তুলে নিতে দেইনি। আমাদের দেশ উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশ। আল্লাহ আমাদের যতটুকু দেন তাতেই আমরা সন্তুষ্ট। এলাকার মানুষকে সাথে নিয়ে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সংগ্রামে সচেষ্ট থাকতে চাই।
ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির (জেপি) উদ্যোগে গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু’র সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জল তালুকদার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, ভাণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোঃ আবু যাহিদ, সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, ইকড়ি ইউপি চেয়ারম্যান তানভীর হোসেন তালুকদার, যুব সংহতির নেতা শাহ আলম পান্নু, উপজেলা ছাত্র সমাজের সদস্য সচিব সালাউদ্দিন রাহাত জোমাদ্দার, ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান, শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক, সমাজ সেবী আলী আহমেদ সেপাই, মাইদুল ইসলাম প্রমুখ।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা জেপি’র সদস্য সচিব ছিদ্দিকুর রহমান টুলু ডাকুয়া, ভিটাবাড়িয়ার ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, জেপি নেতা ইউসুফ আলী আকন, আবুল কালাম পোদ্দার, আরিফ জোমাদ্দার, উপজেলা ছাত্র সমাজের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম শিমুল আকন প্রমুখ।
রাতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ধাওয়া-রাজপাশা আদর্শ মাধ্যমিক ও কারিগরি বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে অংশ নেন এবং বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।