‘পানিহার পাবলিক লাইব্রেরিতে আসবার বাসনা বহুদিনের। সেই কামনা আল্লাহ পাক পূর্ণ করলেন– সে জন্য আমি সেই সর্বনিয়ন্তার নিকটে চির কৃতজ্ঞ। শহরের আবেষ্টনী হতে বহুদূরে পল্লীর নিভৃত কোণে এই পাঠাগার। এখানে এসে পাঠাগারের গ্রন্থাবলীর বৈচিত্র্য এবং বিপুল সংখ্যা দর্শন করে বিস্মিত হলাম। কতটা ঐকান্তিক আগ্রহ এবং সাধনা থাকলে এইরূপ একটি বিরাট সংখ্যার একত্র সমন্বয় করা সম্ভব সে শুধু কল্পনার বিষয়।’
পানিহার পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শনে গিয়ে ১৯৭৫ সালের ৯ এপ্রিল পরিদর্শন বইয়ে এ কথা লিখেছিলেন কবি বন্দে আলী মিয়া। তবে শুধু কবি বন্দে আলী মিয়া একা নন, পানিহার পাবলিক লাইব্রেরি নামের এই আলোকশিখা ঘুরে দেখে গেছেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, উত্তর বাংলার চারণকবি আব্দুল মান্নান, তত্কালীন মন্ত্রী প্রভাষ লাহিড়ী, ধীরেন দত্ত, আইনুদ্দিন চৌধুরীসহ আরো অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তি। বর্তমানে নানা কারণে বিখ্যাত এই আলোকশিখার নিভু নিভু অবস্থা।
ঐতিহ্যবাহী পানিহার পাবলিক লাইব্রেরিটি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায়। রাজশাহী শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার পশ্চিমে গোদাগাড়ী উপজেলা সদরের ডাইংপাড়া মোড়। এখান থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে আঁকাবাঁকা সরু পথ পেরিয়ে ১২ কিলোমিটার দূরের গ্রাম আইহাই। আইহাই থেকে আর দুই কিলোমিটার দক্ষিণে গেলেই পানিহার গ্রাম। শুষ্ক বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রত্যন্ত এই এলাকা আদিবাসী অধ্যুষিত। সরু পাকা রাস্তা। রাস্তার দু’পাশে দিগন্তজোড়া ফসলের ক্ষেতে আদিবাসী নারীদের কর্মব্যস্ততা অনেকটাই পটে আঁকা ছবির মতো! প্রত্যন্ত এলাকা হলে কি হবে, পানিহারের পরিচিতি কেবল দেশেই নয়, বিদেশেও। গ্রামের ওই লাইব্রেরিটাই এর পরিচিতির কারণ। পানিহার লাইব্রেরির দুর্লভ আর বিশাল বই বহরের টানে এখনো ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের অনেক বইপ্রেমী।
কারণটা জানা গেল পাঠাগারের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক রফিকুল আলমের কাছ থেকে। গত বুধবার পানিহার হিতসাধন যুব সংঘ ক্লাবে বসে আলাপকালে পঞ্চাশোর্ধ কাঁচা-পাকা চুলের লম্বা লোকটি যেন ফিরে গেলেন বাল্য স্মৃতি হাতড়াতে। বলেন, ‘এই লাইব্রেরি তৈরি করেছিলেন আমার চাচা এনায়েত উল্লাহ মাষ্টার। আর তাঁর সহযোগী ছিলাম আমরা ক’জন। গ্রামের লোকের কাছে এনায়েত উল্লাহর পরিচিতি এনায়েত পন্ডিত হিসেবে। কারণটাও স্পষ্ট। তিনিই প্রথম শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিলেন বরেন্দ্রর এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে। রফিকুল আলম জানালেন, এনায়েত উল্লাহর বাবা ছিলেন কৃষক। লেখাপড়া না জানলেও তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী। আর এ কারণে ছেলেকে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুর হাইস্কুলে। বাংলা ১৩১৮ সালে ওই স্কুল থেকে তিনি এন্ট্রান্স পাস করেন। তারপর সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। ওই সময় তিনি নবাব বাহাদুর হাইস্কুলের লাইব্রেরির সদস্যও ছিলেন। ওই লাইব্রেরিতে নিয়মিত পড়াশোনা করতেন তিনি। পরে গ্রামের টানে বাড়ি ফিরলেও বইয়ের মায়া ছাড়তে পারেননি এনায়েত পন্ডিত। আর এ কারণেই নিজের গ্রামে একটা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার চিন্তা করছিলেন তিনি।
পানিহারে ফিরে তিনি আইহাই গ্রামে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছাত্র সংগ্রহ করেন। কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে মাসিক ১৫ টাকা বেতনে স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন এনায়েত পন্ডিত। রফিকুল আলম বলছিলেন, তখনকার স্কুলে শুধু বাচ্চারাই পড়তো না, প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র ছিলো যুবক, মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ-সবাই। সেসময় স্কুলের ছাত্রদের পড়াশোনার জন্য বই আনা হতো কলকাতা থেকে। এই বই কিনে পাওয়া কমিশন দিয়ে আরো বই কেনা হতো লাইব্রেরির জন্য। তখনও লাইব্রেরির কোন ভবন নেই। একটা, দুটো করে কেনা বইয়ের সংখ্যা আস্তে আস্তে বাড়লো। এই বই দিয়েই তিনি ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পানিহার লাইব্রেরি। আরো বই কেনার জন্য এনায়েত উল্লাহ হাত বাড়ালেন গ্রামের মানুষের কাছে। পাপ্ত টাকায় আস্তে আস্তে বাড়লো বইয়ের সংখ্যা। প্রথমে বাড়ির একটি বৈঠকঘরে স্থান পেয়েছিলো বইগুলো। পরে নিজের বাড়ির সামনেই একটা মাটির ঘর তুলে সেখানেই স্থাপন করলেন লাইব্রেরির ভবন।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে এ এলাকা থেকে এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন সাগরাম মাঝি। তিনি ছিলেন এনায়েত উল্লাহর সহপাঠী। সহপাঠীর অনুরোধে তিনিও লাইব্রেরির দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। সরকারি সাহায্যে আর এনায়েত উল্লাহর চেষ্টায় আরেক দফা বাড়লো লাইব্রেরির বইয়ের সংখ্যা। কলকাতা থেকে আনা হতে থাকলো জনপ্রিয় সাময়িকী আর পৃথিবীর নামকরা লেখকদের বই। এভাবেই শহর থেকে অনেক দূরের নিভৃত পল্লীতে তিলে তিলে গড়ে উঠলো বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ পানিহার পাবলিক লাইব্রেরি।
১৯৫৮ সালে এটি ‘পানিহার পাবলিক লাইব্রেরি’ নামে মঞ্জুরিপ্রাপ্ত হয়। সে সময় শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে লাইব্রেরিটি পরিচালিত হতো। বছরে অনুদান হিসেবে দেয়া হতো ৫শ টাকা। ১৯৮০ সালে মন্ত্রণালয় এটিকে জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করে। ২০০০ সালে জেলা প্রশাসক লাইব্রেরিটিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট হস্তান্তরের পর নিয়মিত আর কোন অনুদান লাইব্রেরির ভাগ্যে জোটেনি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে এলাকার সাংসদ ও তত্কালীন মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক ৮০ হাজার টাকা অনুদান দেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেয়া হয় ২০ হাজার টাকা। এই টাকায় তৈরি হয় পাঠাগারের জানালা-দরজা, দেয়াল ও পাকা মেঝেসহ টিনের ছাউনির একটি নতুন ভবন। কিছু আলমারিও দিয়েছিল জেলা পরিষদ। আর রফিকুল আলমের অনুরোধে তারই বন্ধু সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলাল উদ্দীন দিয়েছিলেন আরো কিছু অনুদান। সর্বশেষ ক’বছর আগে বিটিভি’র ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে প্রচার হয়েছিলো পানিহার লাইব্রেরি। সেখান থেকে দেয়া হয়েছিল ৫০ হাজার টাকা। সেই টাকাতেও কেনা হয়েছিলো বই। এখন লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা ২৭ হাজারেরও বেশি। কিন্তু গত তিন বছর ধরে লাইব্রেরির জন্য কোন ধরনের সরকারি অনুদান আসেনি।
এনায়েত উল্লাহ মাস্টার মারা যান ১৯৭৫ সালে। এ সময় এ লাইব্রেরির দায়িত্বে আসেন গ্রামের আরেক শিক্ষানুরাগী আব্দুল খালেক মোল্লা। ২০০৭ সালে তিনিও মারা যান। ২০১২ সালে মারা যান লাইব্রেরিয়ান ইকবাল আহম্মেদ। এরপর থেকে কার্যত বন্ধই হয়ে আছে এই লাইব্রেরি। এখন আর প্রতিদিন খোলা হয় না লাইব্রেরির তালা। পাঠকরাও আসেন না আগের মতো। কেউ আসলে এনায়েত উল্লাহ মাস্টারের ছেলেদের বাড়ি থেকে চাবি এনে তালা খুলে ভিতরে ঢুকতে হয়।
এ লাইব্রেরিতে সাময়িকপত্র, বাংলা অনুবাদ, সাহিত্য, উপন্যাস, বিশ্বকোষ, ধর্মীয়, কাব্য ও কবিতা, রহস্য উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী, নাটক, শিশুসাহিত্য, জীবনী, ইতিহাস রচনাবলী, বিজ্ঞান ডিটেকটিভ, অর্থনীতি, উদ্ভিদ বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে রয়েছে ২৭ হাজারেরও বেশি বই পুস্তক। এখন মাঝে মাঝে এগুলো পড়তে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রেজিস্টার খাতার হিসাবে ইংরেজি ও বাংলা ভাষার অনেক পুরাতন বইয়ের সংগ্রহ আছে এখানে। আছে রজনীকান্ত দাস সম্পাদিত ‘শনিবারের চিঠি’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ থেকে শুরু করে দুই বাংলার অনেক সাময়িকী। লাইব্রেরি বন্ধ থাকায় পুরানো মাটির ঘরটি আগে ব্যবহূত হতো গণশিক্ষা কার্যক্রমের স্কুল আর পড়ার ঘর হিসেবে। এখন তাও হয় না। চাষের মওসুমে ঘরটিতে এখন ঠাঁই হয় দূর-দূরান্ত থেকে আসা কামলাদের।
গায়ের এ বিখ্যাত লাইব্রেরির এখনকার জীর্ণদশা দেখে বোঝার উপায় নেই একসময় এখানকার সংগ্রহ দেখে অনেক বিখ্যাত মানুষের চোখই কপালে উঠেছে। স্থানীয় লোকজন জানালেন, কিছুটা পরিবারতন্ত্রের প্রভাবে পানিহার লাইব্রেরি এখন ধ্বংস হতে বসেছে। রক্ষণাবেক্ষণ আর অনুদানের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এই লাইব্রেরির বিশাল ও দুর্লভ সংগ্রহ। একসময় সারাবছরই উত্সব লেগে থাকতো এ গ্রামে। আর এর উদ্যোক্তা থাকতেন এ লাইব্রেরির সাথে সংশ্লিষ্টরা। এখন সেসব হয় না অনেকদিন।