নদী যখন দেশের প্রাণ

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৫, ১৪:২২
খবরের কাগজে সংবাদটা পড়ে খুশি হলাম। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর বাংলাদেশ সফর বিষয়ে যে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন তাতে তিনি জানিয়েছেন যে, তিস্তাচুক্তি রূপায়ণে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। অর্থাত্ ভারত সরকার যদি রীতিনীতি মেনে বাংলাদেশকে তিস্তার জল দিতে চান তাহলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মেনে নেবেন। আমি খুশি হলাম, কারণ কিছুদিন আগে তিস্তার জল নিয়ে ইত্তেফাকে এই কলামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। তার শেষে আশা করেছিলাম শুভবুদ্ধির জয় হবেই। সেটা হয়েছে। সম্ভবত ভারতের প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন পরে যখন ঢাকায় যাবেন তখন তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
কিন্তু তার পরেও বাংলাদেশ কি তিস্তার জল পাবে? আমি ক’দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর বাংলা থেকে ফিরেছি। জলপাইগুড়ি শহরের গা দিয়ে যে তিস্তা এককালে এপার-ওপার ভাসিয়ে বয়ে যেত তার পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম শুধু শুকনো বালির চর, একধারে তিরতিরে জলের ধারা যা জলপাইগুড়ি ছাড়িয়ে মন্ডলঘাট পর্যন্ত পৌঁছাতেই হাঁপিয়ে উঠবে। তারপর যখন তার বাংলাদেশে ঢোকার কথা তখন কতটা কাজে লাগবে! প্রশ্ন হলো, সেই তুমুল জলরাশি কোথায় গেল? খোঁজ নিয়ে জানলাম, পাহাড়ের যে অংশ থেকে  তিস্তা নেমেছে সেখানে ভারতের অঙ্গরাজ্য সিকিমে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু জল সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তিস্তাবাজার হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সেবক ব্রিজের নিচ দিয়ে যখন বয়ে এলো তখন তার তেজ কিছুটা কমে গেছে। তারপর আবার প্রকল্প, আবার সেই জল প্রয়োজনীয় কাজে লাগানোয় জুলাই থেকে বড় জোর অক্টোবর পর্যন্ত ভদ্রগোছের জল ভারত থেকে বাংলাদেশে যাবে। কিন্তু বাকি চার মাসে কিছুটা যোগান রাখতে ভারতকে তার তৈরি প্রকল্পের ছাঁটকাট করতে হবে।
কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। কোনো দেশে যখন জলের প্রয়োজন রয়েছে তখন সেই দেশ তো চাইবেই তার নদীকে ব্যবহার করতে। পাশের দেশে জল পাঠানোর আগে তো সে নিজের দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটাবে। একটু মোটা গলায় বললে, আমার বাড়ির ছেলেমেয়েদের খিদে না মিটিয়ে আমি কেন পাশের বাড়ির মানুষের খিদে মেটাব? হ্যাঁ, সাদাসাপ্টা মানুষ এমন কথাই বলতে পারেন। কিন্তু এই থিওরি মানলে চীন যদি ব্রহ্মপুত্রের সব জল নিজেদের প্রয়োজনে নিয়ে নিতো তাহলে ভারত তো বটেই বাংলাদেশও ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে জল পেতো না। আর যাই করুক এই কাজটা চীন প্রবলভাবে করেনি। ব্রহ্মপুত্রের জল তারা ব্যবহার করেছে কিন্তু পুরোটা অধিগ্রহণ করেনি। আফ্রিকা এবং ইউরোপের অনেক নদী বিভিন্ন দেশের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়েছে এবং সেই সব নদীর জল পাওয়া যাচ্ছে না বলে কোনো দেশ অভিযোগ করেনি। আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ থাকেই। ভারতবর্ষ থেকে যে সব নদী অন্যদেশে গিয়েছে তার অন্যতম হলো ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গার একটি শাখা যা ফারাক্কা হয়ে বাংলাদেশে পদ্মা নামে পরিবর্তিত হয়ে প্রবেশ করেছে এবং তিস্তা নদী। এছাড়া উত্তর বাংলায় কিছু ছোট ছোট নদীর কথা ছেড়ে দিলাম। সেইসব পাহাড়ি নদীতে তো শীতকালে জলই থাকে না। ফারাক্কার বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল প্রতিবাদ করে এসেছে। আগেই লিখেছিলাম, পদ্মার ওপর লঞ্চে দাঁড়িয়ে বালির চর দেখে আমি যখন অবাক তখন সহযাত্রী বাংলাদেশের এক নাগরিক আক্ষেপ করেছিলেন এই বলে, ‘দ্যাখেন, দ্যাখেন, ইন্ডিয়া পদ্মার কি হাল করছে!’ দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। সেই বাল্যকাল থেকে আমি শুনে আসছি পূর্ববঙ্গ নদীমাতৃক দেশ। পদ্মার চেহারা বর্ষায় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সে সময় নদী পার হতে বুকে কাঁপুনি হয়। বছর বারো তেরো বয়সে আমি একটি নাম পড়েছিলাম, আড়িয়াল খাঁ। এটির নাম যেহেতু পুরুষের তাই সম্ভবত নদ বলা হয়ে থাকে। যার লেখা পড়ে নাম জেনেছিলাম তিনি লিখেছেন, সন্ধ্যের পরে লঞ্চে চেপেছিলেম। তখন নদী ছিল ভয়ঙ্কর। ঢেউ উঁচু হতো এতো উঁচুতে যে মনে হতো লঞ্চ জলের তলায় তলিয়ে যাবে। প্রায় প্রাণ হাতে নিয়ে লঞ্চে বসে থাকতে হতো। যখন ওপার থেকে এপারে এসে লঞ্চ পৌঁছাতো তখন ভোরের আলো ফুটেছে। নদ তেমন চওড়া না হলেও ঢেউ-এর সঙ্গে লড়াই করে এপারে পৌঁছাতে প্রচুর সময় লেগে যেতো।
আমি বাংলাদেশে বহুবার গিয়েছি, কিন্তু দুর্ভাগ্য, কখনই আড়িয়াল খাঁ দেখা হয়নি। কিন্তু বন্ধুদের মুখে শুনেছি এখনকার চেহারার সঙ্গে ওপরের বর্ণনার কোনো মিল নেই। আড়িয়াল খাঁ এখন শক্তিহীন। কিন্তু কেন? আমি নরসিংদী থেকে ভৈরববাজার পর্যন্ত নৌকায় গিয়েছি। দেখেছি একপাশে সাদা বালির চর, কাশ ফুটেছে। যেটা স্বাভাবিক। শুনলাম সেই চরের আয়তন বেড়েছে। গাজীপুরে গিয়েছিলাম। বাড়ির জমির শেষে বিশাল বিল ছিল। এখন সেখানে আগাছা ভর্তি। গ্রামের প্রবীণতম মানুষটি বললেন, ওই বিলে ভয়ঙ্কর ঢেউ খেলতো। ওপার থেকে এই মাসে যখন রাত্রে নৌকা আসতো তখন তাকে দিশা দেখাতে সবচেয়ে উঁচু গাছের ওপর হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রাখতে হতো। একাত্তরের যুদ্ধের সময় খানসেনাদের ওই বিলের জলে নাকানি-চুবানি খাইয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। হায়, সেই বিলে এখন জল নেই। এতটাই আবেগতাড়িত ছিলাম যে তখন একটি উপন্যাস লিখেছিলাম, বিলে পানি নেই।
আমি বলতে চাইছি, বিশ্বের উষ্ণতা এতোটাই বেড়ে গেছে যে নদীর জল আর আগের মতো বইছে না। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের তৈরি বাঁধ, প্রকল্প। যা কিছু বর্জ্য পদার্থ তা আমরা নির্বিকার হয়ে নদীতে ফেলে চলেছি। তাতে নদীর নাব্যতা কমছে। জল দূষিত হচ্ছে। ঢাকা থেকে সোনারগাঁ যাওয়ার পথে সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠেছিলাম। কারখানা থেকে বেরিয়ে আসা বাতিল পদার্থ নদীর জলকে ঘন এবং কালো করে ফেলেছে। তার মধ্যে যন্ত্রচালিত নৌকা যাতায়াত করছে। এটা শুধু ওই নদীতে ঘটছে না, এই কলকাতার পাশে বয়ে যাওয়া গঙ্গাতেও কারখানাগুলো একই কাণ্ড করে যাচ্ছিল। কঠোর ব্যবস্থা নেয়ায় সেটা কিছুটা কমে এসেছে। আমাদের নদীগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে না নিয়ে গেলে দেশ বাঁচবে না। নদীর জন্ম দু’ভাগে হয়। এক. তারা পাহাড় থেকে নেমে আসে। পাহাড়ে জমে থাকা বরফ যে হিমবাহ তৈরি করে তা গলে নদী হয়ে যায়, যা সারা বছর জল যোগায়। দুই. ধারে কাছে পাহাড় নেই, মাটি ফুঁড়ে জলধারা বেরিয়ে এসে নদী হয়ে যায়। যেমন ভারতের অজয়, দামোদর। পাহাড়ে জল কমে গেলেও আমাদের মাটির নিচে অঢেল জল রয়েছে। সরকার যদি সেই জলের ব্যবহার করেন তাহলে নদীগুলো আবার ভরাট হতে পারে। বিষয়টা চিন্তা করার মতো।
এই লেখা শুরু করেছিলাম তিস্তাচুক্তি নিয়ে। ছেলেবেলায় দেখেছি, তিস্তার বুকে পাহাড় থেকে জল আসার আগে মাটির নিচ থেকে জল ওপরে উঠে আসে। এই চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর দুই দেশের সরকারকে অনুরোধ করব একত্রিত হয়ে পথ খুঁজতে, যাতে তিস্তা আবার গভীর জলের নদী হতে পারে।
 n লেখক : প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক