মানানসই পোশাক

আপডেট : ১৮ মে ২০১৫, ১২:৩০



স্বাচ্ছন্দ্যময় পোশাক ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখা সহজ হয়। নিজের অভ্যাসের বাইরের পোশাকগুলোকে একেবারেই বর্জন করা উচিত। অনভ্যস্ত পোশাক আপনাকে ফেলে দিতে পারে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে নিজেকে রক্ষা করতেও নিজের পোশাকের অভ্যস্ততা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। আবার নিজের দেহের গঠন অনুযায়ী পোশাক পরলে আপনাকে ভালো দেখাবে। আমাদের এবারের আয়োজনে উঠে এসেছে দেহের গঠন অনুযায়ী পোশাক নির্বাচনের নানা কথা। লিখেছেন নওশীন শর্মিলী
 
সভ্যতার সাথে পোশাকের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আর মানুষের সম্মান, ব্যক্তিত্ব ও রুচিশীলতা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো পোশাক। আর এর জন্য প্রথমেই চাই রুচিসম্মত পোশাক। তাই এই পর্বে আপনাদের জন্য থাকছে পোশাক নিয়ে কিছু কথা। পোশাক নির্বাচনের জন্য উপলক্ষ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উপলক্ষ এবং পরিবেশের সঙ্গে মানানসই এমন মেজাজের পোশাক নির্বাচন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন বিয়ে কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যে ধরনের পোশাক মানানসই, ডিজে শো, কনসার্ট, পার্টিতে সেই ধরনের পোশাক বেমানান। আবার অফিস টাইমে যতটা পরিপাটি থাকা প্রয়োজন, ভ্রমণের সময় ততটা পরিপাটি না হয়ে একটু স্বাচ্ছন্দ্যকর পোশাক বেছে নেওয়াই ভালো। এ ক্ষেত্রে পোশাকের জমিন, রং, আকার, আবহাওয়ার দিকটি এবং তারপরই পরিধানকারীর বয়স, গায়ের রং, আকার ও পেশার ব্যাপারে লক্ষ রাখা জরুরি। তবে পোশাকের রং নির্বাচন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ওপর অনেকখানি প্রভাব বিস্তার করে। সেজন্য পোশাকের রং নির্বাচনের সময় নির্বাচিত রঙটি বা রঙের সমাবেশ যাতে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়ক হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। যদিও রং নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই। পরিধানকারীকে কোন রঙের পোশাকে সুখী ও উত্ফুল্ল দেখায়, আবার কোন রঙের পোশাকে বিমর্ষ দেখায় তাও বিবেচনার বিষয়। এক্ষেত্রে মোটা ছেলে বা মেয়েদের হালকা রঙের পোশাক পরিধান করা উচিত। আর যারা মোটা এবং খাটো তাদের বড় প্রিন্টের পোশাক না পরাই ভালো। তাদের খাড়া রেখাযুক্ত পোশাক পরিধান করা উচিত। এতে দেখতে লম্বা লাগবে। যারা শুকনো এবং লম্বা তাদের বড় বড় প্রিন্টের পোশাক পরলে ভালো মানাবে। আবার যেসব মেয়েদের শরীরের উপরের তুলনায় নিচের অংশ ছোট তারা শর্ট বা মিডিয়াম লেংথের লং টপস পরতে পারেন। টপসের রং যদি মাঝারি থেকে হালকার দিকে হয়, তবে গাঢ় রঙের প্যান্ট বা স্কার্ট পরতে হবে। কোমরে মাঝারি থেকে চওড়া বেল্ট। জুতার ক্ষেত্রে মাঝারি থেকে হাই হিল চলতে পারে। আর যেসব মেয়েদের শরীরের উপর ও নিচের অংশ সমান, তারা মাঝারি থেকে লম্বা ঝুলের টপস পরবেন। স্কার্টের মধ্যে চলবে স্ট্রেট বা ফ্লেয়ারড স্কার্ট। আবার শরীরের নিচের অংশ উপরের তুলনায় ছোট হলে বড় প্রিন্টের স্কার্ট বা প্যান্ট পরা যেতে পারে। এক্ষেত্রে স্কার্ট বা প্যান্টের রং হবে টপসের চেয়ে হালকা।
আমাদের আচার-আচরণের অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয় পোশাকের মাধ্যমে। আপনি যখন জিন্স, টি-শার্ট পরা অবস্থায় থাকেন; খুব স্বাভাবিকভাবেই তখন আপনার আচার-আচরণ তারুণ্যে উজ্জ্বল আর ফুরফুরে হয়ে ওঠে। আবার কর্মব্যস্ততার সময় আপনার গাম্ভীর্য ধরে রাখে পরিপাটি পোশাক। শাড়ি পরা অবস্থায় মেয়েদের মাঝে যে উত্সবের আমেজ ফুটে ওঠে, সালোয়ার বা অন্যান্য পোশাকে ঠিক তেমনই প্রকাশ পায় স্বকীয়তা। তাই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমেজ অনুযায়ী নির্বাচন করা চাই আপনার পোশাক। বিশেষত পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে একটু মার্জিত এবং প্রথাগত অথবা ঐতিহ্যগত পোশাক নির্বাচন করা উচিত। কেননা মার্জিত পোশাকে আপনার উপস্থাপনও হবে মার্জিত এবং পরিশীলিত। আর পারিবারিক অনুষ্ঠানে বয়োজ্যেষ্ঠরা আপনাকে দেখতে পাবেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে উপযোগী রূপে। এ ছাড়া বিশেষ কিছু অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতেও আমরা পোশাকের সাহায্য নিতে পারি। যেমন—২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পোশাকে থাকতে পারে বর্ণমালার আলপনা, আর স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের জন্য পোশাকে দেওয়া যায় রং আর ডিজাইনের ভিন্ন আমেজ। আর উত্সবমুখর দিনগুলোর জন্য উত্সবের মেজাজের পোশাক। তবে আপনার পোশাক  যেন সমাজে আপনার ইমেজকে সঠিকভাবে প্রকাশ করে তার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
তিনটি বিবেচনায় পোশাক নির্বাচন বাঞ্ছনীয়। এক, পোশাক তার উদ্দেশ্য পূরণ করছে কিনা অর্থাত্ দেহের আব্রুর বজায় রাখা এবং গরম বা ঠাণ্ডার প্রকোপ থেকে দেহকে রক্ষা করা। দুই, যিনি পরছেন তার কাছে এটি দৃষ্টিনন্দন কিনা এবং তিন, তিনি পরে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন কিনা। এই তিনটি বিবেচনাকে সামনে রেখেই যেকোনো পোশাক বাছাই করা উচিত। যেমন, পোশাকের উদ্দেশ্য দেহের আব্রু রক্ষা করা। এমন পোশাক নির্বাচন না করাই ভালো, যা পরলে লজ্জা নিবারণের বদলে দেহকে আরও আবরণহীন মনে হয়।
অফিসের বেলায় পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে পেশা, রুচি, বয়স, অফিসের পরিবেশ, পদমর্যাদা, কোথায় কাজ করছেন, সেখানকার নিয়মনীতি কী তা বুঝে পোশাক নির্বাচন করুন। তবে পোশাকে অবশ্যই ব্যক্তিত্বের ছাপ থাকতে হবে। পোশাক হতে হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং ঋতুর সাথে মানানসই। কর্মস্থল অনুযায়ী পোশাকের ধরনও আলাদা হয়। আপনার অফিস যদি নতুন হয়, তবে খেয়াল রাখুন কোনো ড্রেসকোড আছে কিনা। এ ছাড়া অন্যরা কেমন পোশাক পরছে সে দিকেও খেয়াল রাখতে পারেন। মনে রাখবেন, প্রকাশভঙ্গিই আসল কথা। এমন পোশাক পরুন, তা যেন আপনার সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে আপনার পেশাদারিত্ব, বিচক্ষণতা ও রুচিশীলতার পরিচয় দেয়।
আ র ও  কি ছু  টি প স
 
l              অফিসে উগ্র রঙের, অতি উজ্জ্বল, চাকচিক্যময় কোনো পোশাক পরা উচিত নয়।
 
l              শালীনতা বজায় রেখে পোশাক নির্বাচন করা উচিত। শর্টস, স্লিভলেস, লার্জ ভি-নেক বা পাতলা পোশাক নির্বাচন করা উচিত নয়।
 
l              হাই হিল বা হাই নেক জুতা পরা উচিত নয় এবং যেসব জুতা পরলে হাঁটার সময় খুব শব্দ হয়, সেসব জুতা এড়িয়ে চলা উচিত।
 
l              প্রতিষ্ঠানের ধরন, প্রচলিত সংস্কৃতি ও অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দৃষ্টিনন্দন পোশাক নির্বাচন করা উচিত।
 
l              পুরুষের ক্ষেত্রে অফিসে হাফহাতা শার্ট, জিন্সের প্যান্ট ও স্যান্ডেল এড়িয়ে চলা ভালো। স্যান্ডেল যদি একান্ত পরতেই হয় তাহলে যতটা সম্ভব পা ঢাকা থাকে এমন স্যান্ডেল পরা উচিত। উগ্র রং বাদ দিয়ে সাদা, নীল, সবুজ, কালো, ধূসর এবং এই রংগুলোর শেড দিয়ে শার্ট পরুন। কালো, নেভি ব্লু, বাদামি, ধূসর এবং এই ধরনের রঙের প্যান্ট পরুন। অফিসে সাধারণত হালকা রঙের শার্ট ও গাঢ় রঙের প্যান্ট পরা উচিত। এটা দৃষ্টিনন্দন ও মানানসই।
 
l              এখন অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে আরামদায়ক ও কাজ করতে সহায়ক যেকোনো পোশাক অনুমোদন করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী মিটিংয়ে স্যুট, কোট-টাই বা ফরমাল ড্রেস ব্যবহার করা হয় আর টাই ছাড়া শুধু ব্লেজার দিয়ে স্মার্ট-ক্যাজুয়াল পরেন কেউ কেউ। দুটিই পরিস্থিতিভেদে বেশ মানানসই।
ব্য ক্তি ত্ব  প্র কা শে র  দ শ  ম ন্ত্র
l পোশাক নির্বাচনে দুই স্তরে মোট ছয়টি বিষয় প্রাথমিকভাবে মাথায় রাখা হয়। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানের ধরন, প্রচলিত সংস্কৃতি ও আপনার অবস্থান—এই তিনটি বিষয় ভালোভাবে বুঝুন এবং পোশাকে এর সমন্বয় কিভাবে ঘটানো যায় তা ভাবুন। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে প্রচলিত ফ্যাশন, আপনার দেহের গঠন ও ত্বকের রঙের সঙ্গে মানানসই এবং ঋতু অনুযায়ী এমন পোশাক হতে হবে, যা ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়।
l এখন ফ্যাশনবিষয়ক অনুষ্ঠান, ম্যাগাজিন, লেখালেখি, বই ইত্যাদি কোনোটিরই কমতি নেই। পোশাকের স্টাইল, হালচাল, সময়ের ব্যবধানে, ঋতুভেদে প্রতিনিয়ত পাল্টায়। নজর রাখুন এবং নিজেকে আপ-টু-ডেট রাখুন।
l অফিসে দামি পোশাক পরতেই পারেন; কিন্তু দামের ব্যাপারটি মাথায় না রেখে পোশাকটি কতটা রুচিসম্মত এবং আপনার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই কিনা তা আগে বিবেচনা করুন।
l পোশাক পুরোনো হতে পারে; কিন্তু কখনো যেন নোংরা না হয়। ঝকঝকে পরিষ্কার, মাড় দেওয়া (পোশাক বুঝে), আয়রন করা পরিপাটি পোশাক পরুন।
l কাজের সঙ্গে মানানসই ও আরামদায়ক পোশাক পরুন। কাজের চেয়ে পোশাক যেন বেশি গুরুত্ব না পায়। পোশাক যেন আপনার সহকর্মীদের সঙ্গে এমন ব্যবধান তৈরি করে না দেয়, যা দলগত কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
l আপনার পদের অন্য সহকর্মীরা কী ধরনের পোশাক পরছেন খেয়াল করুন। পোশাক নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামবেন না। নিজের ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরিতে পোশাক নির্বাচন করুন।
l পোশাকের সঙ্গে আছে নানা অনুষঙ্গ, যেমন—অলংকার, ঘড়ি, জুতা, সুগন্ধি, চুলের কাটিং, মেকআপসহ অনেক কিছু। সঙ্গে থাকে আরও ব্যবহার্য জিনিসপত্র, যেমন—ছাতা, ক্যাপ, ব্যাগ ইত্যাদি। এগুলো সঠিকভাবে নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে চুলের কাটিং, অলংকার ও সুগন্ধি। এ সবকিছুই পোশাকের সঙ্গে রুচিশীল এবং আপনার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই হওয়া দরকার।
l পর পর দুই দিন একই পোশাক পরা এড়িয়ে চলুন। এতে যেমন নতুনত্ব আছে, তেমনি আছে বৈচিত্র্য। একেক দিন একেক পোশাক, এভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরুন।
l অন্যকে অনুসরণ না করে চেষ্টা করুন নিজে পোশাক নির্বাচন করতে। এমনভাবে করুন, যাতে অন্যরা আপনাকে অনুসরণ করে। এ প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করতে হলে ফ্যাশন, প্রতিষ্ঠান ও আপনাকে কেমন লাগবে—এই তিনটি বিষয়ে আপনাকে আসলেই দক্ষ হতে হবে।
l নতুন পোশাক পরে আপনাকে কেমন লাগছে, তার সঠিক মতামত সংগ্রহ করুন। সে অনুযায়ী পরবর্তী পোশাক নির্বাচন করুন। পোশাক নির্বাচনে প্রয়োজনবোধে প্রশিক্ষণও নিতে পারেন, যা আপনার দেহের গঠন ও ত্বকের রং অনুযায়ী অফিস পোশাক, পার্টি পোশাক, ভ্রমণ পোশাক, ঋতুভেদে পোশাক ইত্যাদি বিষয়ে আপনাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
 
মডেল- শখ
পোশাক- হ্যাঙ্গার
ছবি- তাহের মানিক