সম্ভাবনা সত্ত্বেও বাংলাবান্ধায় কমলার চাষ বাড়ছে না

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৫, ০১:৪৬

পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা অঞ্চলে কমলা চাষের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি সহযোগিতার অভাবে কমলার আবাদ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে উপনীত হতে পারেনি। যদিও চা আবাদ সাফল্য লাভ করেছে শতভাগ।

সম্প্রতি বাংলাবান্ধা এবং তেঁতুলিয়া অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের অজ্ঞতাই কমলা আবাদের এলাকা বিস্তৃত না হবার মুখ্য কারণ। কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসার কারণে চায়ের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে। ভারতের চা এবং কমলা চাষের অঞ্চল হিসাবে পরিচিত দার্জিলিং জেলার বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষতঃ জলপাইগুড়ি এলাকার মাটি এবং জলবায়ুর সাথে পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী এলাকা তেঁতুলিয়া এবং বাংলাবান্ধার মাটি এবং আবহাওয়ার বিশেষ অমিল নেই। এই অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে এ প্রশ্ন জাগরিত হয় যে, জলপাইগুড়ি এলাকাতে চা এবং কমলা আবাদ করা গেলে এই অঞ্চলে কেন চা এবং কমলা আবাদ করা যাবে না। এই অবস্থাতে কেউ কেউ উত্সাহিত হয়ে ওঠেন চা এবং বিশেষ করে কমলা আবাদে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কমলা গাছ হলেও সে গাছগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে কমলা না ধরায় এই এলাকার কৃষকেরা কমলা আবাদের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ কমলা গাছ কেটেও ফেলে।
কিন্তু গাছ কাটেননি বাংলাবান্ধার বড়বাড়ী হাঁড়িভাষা (বেরুবাড়ী সংলগ্ন) এলাকার সাহারাফ কাকা প্রধান। ১৯৯৮ সালে তিনি কমলার চারা রোপণ করেন। ২০০৯ সালে তার গাছে প্রথম কমলা ধরে। সাহারাফ কাকা প্রধান জানান, ঐ বছরে তিনি ৩০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করেন। গত দুই বছরে তিনি যথাক্রমে এক লাখ টাকার ও দুই লাখ টাকার কমলা বিক্রি করেছেন। এ বছরে তিনি আরো বেশি ফল পাবেন বলে আশা করছেন। তিনি জানান, প্রতি জুনে কমলা ধরতে শুরু করে। চলে অক্টোবর নভেম্বর পর্যন্ত। আলাপ হয় একই গ্রামের মোঃ হারুন প্রধান এবং আবুল হোসেন প্রধানের সাথে। তারা জানান, সুপারি গাছের ফাঁকে ফাঁকে তারা কমলা চারা রোপণ করেন। তাদের মত আরো অনেকে একইভাবে কমলার চারা রোপণ করেন। এখন অনেকের গাছেই কমলা ধরেছে দেখে আরো অনেকে উত্সাহী হয়ে উঠেছেন কমলা আবাদে।
তবে কমলা আবাদের জন্য উত্কৃষ্ট বীজ এবং আবাদের কৌশল জানা থাকা দরকার। ২০০৯ সালের দিকে এলজিইডি কমলা এবং চা আবাদে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিতে শুরু করে। কৃষকদের আগ্রহ ছিল মূলতঃ চা আবাদের দিকে। এলজিইডি চায়ের ১৫৬টি চারা, রোপণের ব্যয় এবং বিনামূল্যে সার সরবরাহ করে। ফলে অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে চা আবাদের এলাকা। বেসরকারি চা কোম্পানিগুলো এই এলাকায় চায়ের বাগান প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে। দ্রুত চায়ের আবাদ সম্প্রসারিত হয়। তবে কমলা আবাদ বেশিদূর এগোয়নি। ২০০৯ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় বিশেষ প্রকল্প হিসেবে পঞ্চগড় জেলায় একজন উপ-পরিচালক নিয়োগ করে। তার অধীনে ৪ জন কৃষিবিদ দেয়া হয়। এই প্রকল্পের অধীনে এলাকার প্রায় ২০০ যুবক-যুবতীকে ২৫/৩০ জনের দল গঠন করে কমলা চাষের উপর বৃত্তিমূলক  প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং তাদের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ৪৬৮টি করে চারা ৩ একর জমিতে রোপণ করা হয়। ওই জমিতে পূর্ব থেকেই সুপারি গাছ ছিল। অর্থাত্ আমরা ধরে নিতে পারি এটা অতিরিক্ত ফসল হিসেবে পাওয়া যাবে। এরকম ব্লক ৫ জন আদর্শ কৃষককে সরকার বিনামূল্যে প্রদান করে। তারা প্রায় ১২ একর জমির মধ্যে এই সকল কমলার চারা রোপণ করে। আকস্মিকভাবে সরকার এ প্রকল্পটি ২০১৩ সালে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। ফলে স্থানীয় কমলা চাষিরা তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েন। এ কমলা চাষে উত্সাহ হারিয়ে ফেলে চাষিরা। সামান্যতম পরামর্শের জন্য তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েও প্রকৃত পরামর্শ না পেয়ে তারা নতুন করে কমলা চাষ বন্ধ করে দেয় এবং এ গাছগুলোর পরিচর্যাও পূর্বের ন্যায় করছে না। তবে হাঁড়িভাষা (বেরুবাড়ি সংলগ্ন) এলাকার সাহারাফ কাকা প্রধান হাল ছাড়েননি। সে তার নিজস্ব প্রযুক্তিতে চাষ করে যাচ্ছে এবং পরিচর্যা করে ভাল সুফল পাচ্ছে। অনেকে বাংলাবান্ধা ঘুরতে এসে তার বাগান ও কমলা দেখে অভীভূত। একটি কমলা ৩০ থেকে ৫০ টাকা দরেও কিনে নিয়ে যান। এ কমলা দেখার জন্য দেশের বহু অঞ্চল থেকে বহু লোক এ এলাকায় এবং তার বাগানে এসেছেন। অনেক আশ্বাসও দিয়েছেন সাহায্যের জন্য। কিন্তু কোন আর্থিক সাহায্য কৃষক পায়নি।

এলাকার কৃষকেরা জানান. কমলা আবাদে তারা আগ্রহী। কিন্তু উন্নত বীজ, বপনের পদ্ধতিগত প্রযুক্তি তাদের জানা নেই। সরকারি নার্সারি থেকে উন্নতমানের বীজ সরবরাহ করা হলে এবং কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ হতে কমলা চাষের পদ্ধতি কৃষকদের জ্ঞাত করা হলে এই এলাকায় খুব সহজেই কমলার আবাদ সমপ্রসারিত করা যাবে। কৃষকেরা আগ্রহী। দরকার শুধু সরকারের এগিয়ে আসা। তেঁতুলিয়া কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কমলা চাষে কৃষকদের আগ্রহ রয়েছে। আমরা তাদেরকে সহযেগিতা করার জন্য প্রস্তুত। প্রযুক্তি এবং উন্নত কমলার বীজ সরবরাহে যা করণীয় তা তারা করবেন। ইতিমধ্যেই তারা বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন।