স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ; জয়দেবপুরে রুখে দাঁড়ায় ছাত্র-জনতা

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৫, ১০:৩৯
আগামীকাল বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের ৪৪তম বার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনে জয়দেবপুরে (গাজীপুর) ভাওয়াল রাজবাড়িতে তত্কালীন সেনানিবাসে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার উদ্দেশে ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেবের নেতৃত্বে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একদল সৈন্য জয়দেবপুর সেনানিবাসে আসবে এই খবর পেয়ে জয়দেবপুরের সর্বস্তরের জনসাধারণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড গড়ে তোলেন। ঐ সময় জয়দেবপুর সেনানিবাসের অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্ণেল মাসুদ ও সহঅধিনায়ক ছিলেন মেজর কে এম শফিউল্লাহ। গাজীপুরের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা মরহুম শামসুল হক পাক হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য মরহুম হাবিব উল্লাহর নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি হাই কমান্ড এবং বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক এমপি’কে আহবায়ক করে নয় সদস্য বিশিষ্ট একটি অ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়। নেতৃবৃন্দের পরামর্শে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা পাক হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধকল্পে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তায় বহু সংখ্যক ব্যারিকেড তৈরি করে। দুপুরের দিকে পাক হানাদার বাহিনী চান্দনা চৌরাস্তায় উপস্থিত লোকজনকে অস্ত্রের মুখে ব্যারিকেড সরাতে বাধ্য করে সেনানিবাসে প্রবেশ করলে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা পুনরায় রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। ছাত্র-জনতা জয়দেবপুর রেলওয়ে লেভেল ক্রসিংয়ে মালগাড়ির ওয়াগন ফেলে বন্দুক ও বাঁশের লাঠি নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে।
সেনানিবাস থেকে ফেরার পথে জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিংয়ে পাক হানাদার বাহিনী উপস্থিত হলেই স্থানীয় সাহসী বীরদের বন্দুক গর্জে উঠে। পাক হানাদার বাহিনীর প্রতি মরহুম কাজী আজিম উদ্দিন আহমেদ (মাষ্টার) স্বীয় বন্দুক দিয়ে প্রথম গুলিবর্ষণ করেন। ওই সময় হানাদার বাহিনী পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে নিয়ামত, মনু খলিফা শহীদ হন এবং সন্তুষসহ বহু লোক আহত হন।
জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড থাকায় হানাদার বাহিনী পায়ে হেঁটে চান্দনা চৌরাস্তায় উপস্থিত হলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মিয়ার নেতৃত্বে স্থানীয় ছাত্র-জনতার সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে তারা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। এখানে গুলিতে হুরমত আলী শহীদ হন এবং কানু মিয়াসহ অনেকে আহত হন। চিকিত্সাধীন অবস্থায় পরে কানু মিয়া মারা যান।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলেও এর পূর্বেই ১৯ মার্চ গাজীপুরে তথা জয়দেবপুরের মাটিতেই সূচিত হয়েছিল দখলদার বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালির পক্ষ থেকে প্রথম সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এই দিবসকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তত্কালীন ১৬ বেঙ্গল রেজিমেন্টের উদ্যোগে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-গাজীপুর সড়কের মিলনস্থল চান্দনা চৌরাস্তায় মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’’ (এক হাতে রাইফেল অপর হাতে গ্রেনেড) নির্মাণ করা হয়। এই ভাস্কর্যটি এখনো দূর-দূরান্তের লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এ দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে গাজীপুর জেলা প্রশাসন, আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনসমূহ ও শহীদ হুরমত স্মৃতি সংসদ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।