পেট্রোল বোমায় দগ্ধ আরো ৪ জন রবিবার মারা গেছেন। এর মধ্যে মাগুরা শহরের অদূরে মঘীরঢালে বালুর ট্রাকে পেট্রোলবোমা হামলায় দগ্ধ তিন জন এবং চাঁদপুরের একজন।
বিকেল ৫টার দিকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে মাগুরার দগ্ধ মতিন বিশ্বাস (২৫) ও একই সময় চাঁদপুরে গত বুধবার রাতে পেট্রোলবোমা হামলায় দগ্ধ ট্রাকমালিক খন্দকার শরিফুল ইসলাম (৩৫) মারা যান। এর আগে গতকাল সকালে শাকিল মোল্লা (২০) নামে মাগুরায় দগ্ধ এক যুবক মারা যান। একই ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ রওশন আলী বিশ্বাসকে (৩৫) মাগুরা থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনার পথে শনিবার মধ্যরাতে তিনি মারা যান। এছাড়া চিকিত্সাধীন দগ্ধ আরো ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে বার্ণ ইউনিটের চিকিত্সকরা জানিয়েছেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে মারা যান শাকিল মোল্লা। ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিত্সক ডা. পার্থ শংকর পাল জানান, শাকিলের শ্বাসনালীসহ শরীরের ৬৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। অন্যদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানান তিনি। বিকেল ৫টার দিকে মারা যান মতিন। তারও ৫৬ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল বলে জানান তিনি। এ নিয়ে মাগুরায় ট্রাকে পেট্রোল বোমা হামলার ঘটনায় দগ্ধ ৯ জনের মধ্যে তিন জন মারা গেলেন।
ঢাকা মেডিক্যালের বার্ণ ইউনিটের আবাসিক চিকিত্সক ডা. পার্থ শঙ্কর পাল জানান, পেট্রোল বোমায় ট্রাকমালিক খন্দকার শরিফুল ইসলামের ৮৮ শতাংশ পুড়ে গেছিল। চিকিত্সাধীন অবস্থায় বিকেল ৫টার দিকে তিনি মারা গেছেন। গত ১৮ মার্চ চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ও রঘুনাথপুর এলাকায় বুধবার রাতে দু’টি পণ্যবাহী ট্রাকে পেট্রোলবোমা হামলা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় ট্রাকচালক জাহাঙ্গীর (৪০) দগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। জাহাঙ্গীরের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলায়। এ ছাড়া গুরুতর দগ্ধ হন খোরশেদ (৩০), রুবেল (৩৮) ও শরিফুর (৩৫)। রাতেই তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।
এদিকে নিহত শাকিল মোল্লা মাগুরা সদর মালি গ্রামের ইসলাম মোল্লার ছেলে। শনিবার রাত ৮টার দিকে মাগুরা—যশোর মহাসড়কের মঘীরঢাল এলাকার মহাসড়কে বালুর ট্রাকে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। এতে ৯ জন ট্রাক শ্রমিক গুরুতর দগ্ধ হন। মাগুরা সদর হাসপাতালের চিকিত্সক ডা. দেবাশিষ বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানান, পেট্রোলবোমায় দগ্ধদের শরীরের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ পুড়ে গেছে। তাদের প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।
বার্ন ইউনিটে ভর্তি দগ্ধ ৬ জন হলেন— মাগুরা সদর উপজেলার মালিক গ্রামের নিহত রওশন বিশ্বাসের ছোট ভাই ইলিয়াস হোসেন (৩২), একই গ্রামের আরব আলী (৩৮), ইয়াদুল হোসেন (৩০), নাজমুল হোসেন (৩৫), ফারুক মিয়া (৩৫) ও ইমরান হোসেন (২৫)।
আমাদের মাগুর প্রতিনিধি জানান, নিহত ও আহতদের বাড়ি মাগুরার মালিক গ্রামে চলছে শোকের মাতম । এরা সকলেই দরিদ্র বালু শ্রমিক। এদিকে বিকালে এই ঘটনার প্রতিবাদে জেলা আওয়ামীলীগ শহরে গণমিছিল বের করে ।
শনিবার মধ্যরাতে নিহত রওশন আলীর লাশ রবিবার সকালে এম্ব্যুলেন্সে করে মাগুরায় আনা হয়। সদর হাসপাতালে লাশ দেখে স্বজনরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এর পর লাশ নেয়া হয় সদর উপজেলার মালিক গ্রামে। ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায় সকলের মধ্যে শোকের ছাঁয়া বিরাজ করছে। বাদ আসর নিহত রওশন আলীর নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তাকে ওই গ্রামে দাফন করা হয়েছে। নিহত শাকিলের লাশ লাশ গতকাল পর্যন্ত মাগুরায় পৌঁছেনি।
নিহত রওশন আলীর ভাই রকিব বিশ্বাস জানান, তার ভাই মরার আগে ছেলে মেয়েদের তাকে দেখার জন্য বলে যান। এদিকে নিহত ও আহতদের স্বজনরা ঘটনার বিচার দাবী করছেন। মাগুরার সহকারী পুলিশ সুপার সুদর্শন কুমার রায় জানান, এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
আমাদের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, পেট্রোল বোমার আগুনে মারা যাওয়া দু’জনই ছিলেন পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি। নিহত রওশন আলির স্ত্রী সুকুরনেছা গতকাল বারবার মুচ্ছা যাচ্ছেন। শনিবার সন্ধায় পথে চেয়ে বসে ছিল স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তান। ঘরে খাবার ছিল না। কাজ শেষে মুজরি পেয়ে বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরলে রান্না হবে। তারপর হবে একসাথে বসে খাওয়া দাওয়া। রওশান আলি স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে আর কোন দিন এক সাথে বসে খাবেন না।
টাকা না থাকায় শুক্রবারেও তাদের বাজার হয়নি। কাজে যাওয়ার আগে তিনি বড় ছেলে সাকিবকে বলে যান, ’বাবা তুমি মাদ্রাসায় যাও। কাজ শেষে বাজার করে বাড়ি ফিরব।’ গতকাল রবিবার সকালে রওশান আলি বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু লাশ হয়ে। পরিবারটি এখন দিশেহারা। রওশনের স্ত্রী বিলাপ করে বলতে থাকেন, তিন নাবালক সন্তান নিয়ে তিনি কিভাবে বেঁচে থাকবেন। যারা তার স্বামীকে পুড়িয়ে মেরেছে তাদের বিচারও চান সুকুরনেছা।
একই গ্রামের অপর শ্রমিক শাকিল গতকাল সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ণ ইউনিটে চিকিত্সাধিন অবস্থায় মারা যান। তিনি ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান ও একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি। পুত্র শাকিলকে হারিয়ে তার বাবা ইসলাম মোল্লা মানুষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি কখনও কাঁদছেন, কখনও মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। মা ও অপর তিন ভাই-বোন শোকে নির্বাক। বাবা ইসলাম মোল্লা বিলাপ করে জানান, শাকিলের বয়স ৩০ হলেও স্বল্প আয়ের সংসারে মা-বাবা, ভাই-বোনের কথা ভেবে সে বিয়ে করেনি। কিন্তু সবার সুখের পাখি, আমাদের দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেল। মালিকগ্রামের এ দু’জন দিন মজুর কোন রাজনীতি করতেন না। গ্রামবাসি দু’জন নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ। কেউই এ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। তারা এ নৃশংস হত্যার কান্ডের বিচার দাবি করেন।
