তিউনিশিয়ার রাজধানী তিউনিশের বার্দো জাদুঘরে বন্দুকধারীদের ২৩ পর্যটককে গুলি করে হত্যার দায় স্বীকার করেছে ইরাক-সিরিয়া ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ট্যুইটারে প্রকাশ করা অডিও বার্তায় আইএস এই হামলাকে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা বলে আখ্যায়িত করে। এই হামলাকে নিজেদের সফলতা হিসাবেও বর্ণনা করেছে তারা। ইরাক ও সিরিয়ায় চলমান অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সুসংগঠিত করেছে আইএস। দুটি স্বাধীন দেশের ভূখণ্ড নিয়ে গড়ে তুলেছে নিজেদের ‘ভূখণ্ড’। এখন পর্যন্ত নিজেদের অধিকৃত ভূখণ্ডের বাইরে কোন ধরনের হামলা চালায়নি জঙ্গি গোষ্ঠীটি। তবে তিউনিশিয়ার জাদুঘরে হামলার মধ্য দিয়ে আইএস নতুন বার্তা দিলো বিশ্ববাসীর কাছে।
নতুন এই বার্তাটি হলো, তাদের নজর এখন লিবিয়া, তিউনিশিয়াসহ বেশ কিছু দেশের ওপর। ঐসব দেশে নিজেদের আধিপত্য গড়ে তুলতে তারা সেখানকার নাগরিকদের দলে ভিড়িয়ে প্রশিক্ষিত করে কাজে লাগানোর কৌশল হাতে নিয়েছে। তার প্রমাণ- ট্যুইটারে প্রকাশিত অডিওবার্তায় হামলাকারী দুই জনের নাম আবু জাকারিয় আল-তিউনিশি এং আবু-আনাস আল-তিউনিশি বলে দাবি করেছে আইএস।
জাদুঘরে হামলার ঘটনায় নিহত পর্যটকের বেশিরভাগই বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের নাগরিক। জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো বরাবরই পশ্চিমাদের শত্রু মনে করে থাকে। কারণ ইরাক এবং সিরিয়াতে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বেশিরভাগই পশ্চিমা বিশ্বের দেশ। তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে এবং তাদের বিরুদ্ধে পরোক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা করতেই মূলত চালানো হয় জাদুঘরের এই হামলা। তাছাড়া এই তিউনিশিয়ায় আরব বসন্তের সূত্রপাতের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের ইসলামিক শাসনতন্ত্র বিলোপ হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হচ্ছে তিউনিশিয়ায় । সম্ভবত এসব কারণেই আইএসের টার্গেটে পরিণত হয়েছে তিউনিশিয়া। পার্শ্ববর্তী দেশ লিবিয়ার অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়েছে তিউনিশিয়াও। দেশটির বিপুল সংখ্যক নাগরিক সিরিয়া এবং ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রশিক্ষিত হচ্ছে। এই সুযোগগুলো কাজে লাগাচ্ছে আইএস। সামরিক পোশাক পরেই সেদিন হামলায় অংশ নিয়েছিলো দুই জঙ্গি। তিউনিশের পার্লামেন্ট ভবনের খুব কাছের ঐ জাদুঘরটি হামলায় দেশটির নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তবে হামলার পর থেকে নড়েচড়ে বসেছে দেশটির সরকার। দেশটির চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানও শুরু হয়েছে সেখানে। জাদুঘরে হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখন পর্যন্ত ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। রাজধানীসহ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মাঠে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনীকেও। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, আটক ব্যক্তিদের অর্ধেকই হামলার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলো। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট বেজি চেইড ইসেবসি বলেন, এই সব সন্ত্রাসীরা আমাদের ভীত করতে পারবে না। যে কোন কিছুর বিনিময়ে প্রতিরোধ করতে এদের মূল উত্পাটন করবো আমরা। গণতন্ত্র বেঁচে থাকবে, গণতন্ত্রের জয় হবেই। প্রধানমন্ত্রী হাবিব এসিদও প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সাথে সুর মিলিয়েছেন। তার মতে, আমাদের ইতিহাসে এটি একটি সঙ্কটময় সময়। পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময়ও এটি।
হামলার পর তিউনিশিয়ার সাধারণ মানুষ ঐ জাদুঘরের সামনের রাস্তায় এসে পতাকা উড়িয়ে এবং মোমবাতি জ্বালিয়ে হামলার প্রতিবাদ জানায়। বিশ্ব নেতারাও এই হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে সন্ত্রাস নির্মূলে তিউনিশিয়াকে সমর্থন দেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। শুধু জাতিসংঘ নয় সন্ত্রাস দমনে তিউনিশিয়ার পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
তিউনিশিয়ার পূর্বাঞ্চলের লিবিয়ার অস্থিতিশীলতার কারণে সেখানে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। তিউনিশিয়ার মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সাথে যোগসাজশে লিবিয়ার কিছু সন্ত্রাসী গ্রুপ সীমান্ত দিয়ে এসব অস্ত্র পাচার করছে দেশটিতে। অন্যদিকে ইরাক ও সিরিয়ায় প্রশিক্ষণ নেয়া তিউনিশ নাগরিকরা দেশে ফিরে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। আর এদের মদদ দিচ্ছে ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো। আরব বসন্তের পর এই অঞ্চলে তিউনিশিয়াই একমাত্র দেশ যারা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পুনর্গঠন করেছে। সেখানে কট্টরপন্থি শাসনতন্ত্রের বদলে এখন গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর এই গণতান্ত্রিক সরকারের মূল ভিত্তি ধর্ম নিরপেক্ষতা। একারণে ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো এই গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতিকে ভালোভাবে নিতে পারেনি।
