বহুমুখী সঙ্কটে জর্জরিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা কাটছে না। সাড়ে চার মাস পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন এবং শ্রেণিকক্ষের ‘তালা’ খুললেও অধিকাংশ বিভাগেই ক্লাস হয়নি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। শিক্ষক সমিতি ভিসির অপসারণের দাবিতে অনড়। অন্যদিকে ভিসিকে বহাল রাখার পক্ষে আছেন শিক্ষকদের একটি বড় অংশ।
২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে দুইটি অনুষদ, ছয়টি বিভাগ ও ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে রংপুরে স্থাপিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। সে সময়ের ভিসি অধ্যাপক আব্দুল জলিল মিয়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন না নিয়ে ৩৩৮ জন অতিরিক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেন। এই নিয়োগের স্থায়ীকরণ এবং কয়েকজন শিক্ষকের পদোন্নতির দাবিতে ২০১৩ সালে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভিসি অধ্যাপক আব্দুল জলিল মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে মেয়াদ শেষের এক দিন আগে তাকে অপসারণ করা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম নূর-উন-নবী যোগ দেন ভিসি হিসাবে। ২০১৩ সালের মে মাসে যোগদানের পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু আগের ভিসির সময়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়নি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। এর মধ্যেই শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছয় মাসের বেতন আটকে থাকে।
তখন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আতফুল হাই শিবলীর নেতৃত্বে গঠন করা তদন্ত কমিটির সুপারিশের আলোকে ১০ কোটি টাকা গুচ্ছ বরাদ্দ দিয়ে আপতকালীন সমস্যা সমাধানের বন্দোবস্ত করে সরকার। এছাড়াও সাবেক ভিসির আমলে অতিরিক্ত নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদের অনুমোদন আসা সাপেক্ষে ক্রমান্বয়ে স্থায়ীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়। এতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২তম সিন্ডিকেট সভায় ২৭ জন প্রভাষককে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রাপ্তরা অনেক আগেই এই পদের যোগ্যতা অর্জন করলেও তাদের পদমর্যাদা ও প্রাপ্য সুবিধাদি সিন্ডিকেট সভার দিন থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর ফলে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এ বিষয়ে ভিসির কাছে অর্জিত সময় থেকে পদমর্যাদা ও প্রাপ্য সুবিধাদি দিতে বারবার আবেদন করা হয়। কিন্তু ভিসি তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বিষয়টি নিরসনে গত ২৭ অক্টোবর শিক্ষক সমিতি সাধারণ সভা করার মাধ্যমে ভিসি এ কে এম নূর-উন-নবীকে স্মারকলিপি দেয়। এতেও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রথমে তাকে বয়কট, পরে দুই নভেম্বর থেকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক পদ থেকে গণপদত্যাগের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে শিক্ষক সমিতি। এক পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে নামেন শিক্ষকরা। সাত ডিসেম্বর ভিসির অপসারণ চেয়ে প্রশাসনিক ভবনে তালা দেন আন্দোলনকারীরা। দুই ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ধর্মঘট ডাকলে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যেই আন্দোলনকারীদের ওপর বহিরাগতরা দুই দফা হামলা করে। এতে ক্ষোভ আরো বাড়ে। সর্বশেষ গত রবিবার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে তালা ভেঙ্গে প্রশাসনিক ভবন ও শ্রেণিকক্ষ খুলে দেয়া হয়। শিক্ষক সমিতিসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। ক্যাম্পাস এখনও বিরানভূমি। তালা ভেঙ্গে কোনো সমাধান আসবে না। ভিসিকে পদত্যাগ করতে হবে।
দুই শিবিরে বিভক্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
এদিকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অচলাবস্থার মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দুইটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। শিক্ষকদের একাধিক সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৯ শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ৮০ জন শিক্ষক সমিতিসহ আন্দোলনে রয়েছেন। আবার প্রায় ৫০ জন ভিসির পক্ষে রয়েছেন। ভিসি পক্ষের শিক্ষকদের অধিকাংশই বর্তমান ভিসির সময় নিয়োগ পেয়েছেন। শিক্ষকদের এই বিভক্তিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে গত রবিবার ক্লাস শুরু হলেও গতকাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগে ক্লাস শুরু হয়নি। হিসাব বিজ্ঞান, গণিত, লোক প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও বাংলা বিভাগে নির্ধারিত ক্লাস গ্রহণ করা হয়েছে। তবে অন্য বিভাগগুলোতে তেমন ক্লাস হয়নি। এ প্রসঙ্গে শিক্ষক সমিতির সভাপতি আর এম হাফিজুর রহমান বলেন, তালা ভেঙ্গে সমস্যার সমাধান হয়নি। ভিসিকে পদত্যাগ বা অপসারণ করতে হবে। দাবি না পূরণ হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।
ভর্তি পরীক্ষার অনিশ্চয়তা কাটেনি
চলমান অচলাবস্থার সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তিচ্ছুদের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন পর্যন্ত ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। অথচ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এ কে এম নূর-উন-নবী বলেন, ভর্তি পরীক্ষাসহ সার্বিক বিষয়ে শিক্ষক সমিতির সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদেরকে কাজে ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে। বুধবার শিক্ষক সমিতি একটি চিঠি পাঠিয়েছে। তারা বলেছে, দ্রুতই কাজে ফেরার ব্যাপারে জানাবে। আর তিনদিন অপেক্ষা করব। তালা ভেঙ্গে ক্লাস চালু করেছি। সকল ক্লাস চলছে। যে দুই-একটি বিভাগে ক্লাস হচ্ছে না সেগুলোতেও দ্রুতই ক্লাস শুরু হবে। ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত এক সপ্তাহের মধ্যেই জানানো হবে। পদত্যাগের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের এ দাবির যৌক্তিকতা নেই। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে তারা ফায়দা তোলার চেষ্টা করছেন। এটা কতটুকু যৌক্তিক?