ঠাকুরগাঁও জেলার প্রায় সব বধ্যভূমি অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে রয়েছে। স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও তেমন কোন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। অপরদিকে মানিকগঞ্জে বেদখল ও অবহেলায় পড়ে রয়েছে বধ্যভূমিগুলো। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে এমনটা হয়েছে। নান্দাইলের কালিগঞ্জ রেলওয়ে বধ্যভূমি এখনো অবহেলিত। এখানে নির্মাণ করা হয়নি স্মৃতিস্তম্ভ। এদিকে নীলফামারীর সৈয়দপুরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজ আর্থিক সংকটে আটকা পড়ে আছে। খবর আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।
ঠাকুরগাঁও: ঠাকুরগাঁও জেলার প্রায় সব বধ্যভূমি অযত্নে-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও তেমন কোন সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে ঠাকুরগাঁও শহরের টাঙ্গন নদীর পাশে ও পীরগঞ্জের বড় গণকবরটি এখনো রয়েছে অবহেলিত। পীরগঞ্জ শহরের ২ কি.মি. পশ্চিমে জগথা গ্রামের এই গণকবর দেখতে লোকজন এখনো ভিড় করে।
বছরের বিশেষ দিন ছাড়া এগুলোর কেউ খোঁজ-খবর না রাখায় কালক্রমে বধ্যভূমিগুলোর অবস্থান হারিয়ে যাচ্ছে। গুটিকয়েক স্থান দায়সারাভাবে চিহ্নিত করা হলেও সংস্কারের অভাবে সেগুলো পড়ে রয়েছে। সেখানে গজিয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছ।
সদর উপজেলার ফাড়াবাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধার পিতা শেখ শহর আলী ও তার ভাই শেখ বহর আলীসহ ১৯ নিরীহ গ্রামবাসীকে ধরে এনে হত্যা করে তাদের লাশ আব্দুর রশিদ ডিগ্রী কলেজের পার্শ্বে একটি কূপে ফেলে দেয়। এখানে নেই কোন স্মৃতিসৌধ। হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা বড় গণহত্যাকাণ্ড চালায় সদর উপজেলার জাঠিভাঙ্গা গ্রামে। সেখানে স্থানীয় কিছু লোকের সহায়তায় আশ-পাশের গ্রামের প্রায় ৩ হাজার নিরীহ গ্রামবাসীকে ধরে এনে পাকবাহিনী গুলি করে হত্যা করে এবং তাদের লাশ মাটি চাপা দেয়। এখানে অবশ্য স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিকস্থানে গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী ও তার দোসররা। এর মধ্যে জাঠিভাঙ্গা, খুনিয়া দীঘিরপাড়, দেশিয়াপাড়ায় স্থানীয়ভাবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও অন্য গণকবরগুলো রয়েছে অরক্ষিত। নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ অযত্নে পড়ে রয়েছে।
এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এমপি রমেশ চন্দ্র সেন জানান, সরকার জাঠিভাঙ্গায় একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করেছে। অন্যগুলোও তৈরি করার করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
ঘিওর (মানিকগঞ্জ): মানিকগঞ্জে বেদখল আর অবহেলায় পড়ে রয়েছে বধ্যভূমিগুলো। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, সরকারের উদাসীনতার কারণেই এমনটা হয়েছে। তরাঘাট হত্যাকাণ্ড : মানিকগঞ্জের সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড ঘটে ঢাকা-আরিচা সড়কের তরাঘাটে। বর্তমানে ব্রিজ হলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে (কালীগঙ্গা নদী) ফেরি দিয়ে মানুষ পার হতো। মানিকগঞ্জ শহরের তিন কিলোমিটার দূরে গুরুত্বপূর্ণ এই ঘাটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী আবদুস সাত্তার জানান, ‘বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষজনকে ধরে এনে এই ক্যাম্পে নির্যাতন করা হতো। তারপর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিত। কখনো কখনো অর্ধ-জীবন্ত অবস্থায় নদীতে ফেলে দেয়া হতো। বলাই বাবুর কুয়া : তরাঘাটের পশ্চিম পাড়ে ছিল হিন্দু তাঁতীদের গ্রাম। এই গ্রামটির বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। গুলি করে হত্যা করেছিল বেশ কয়েকজনকে। নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বলাই বাবু ও তাঁর স্ত্রীকে। জীবন্ত কুয়ায় ফেলে তাঁদের বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে রাজাকাররা। বছর পাঁচেক আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কুয়াটিকে বাঁশ দিয়ে ঘিরে একটা সাইন বোর্ড লাগানো হয়েছিল। কিন্তু এখন তার কোনো চিহ্ন নেই। কুয়াটি ভরাট করে ফেলা হয়েছে। পিটিআই বধ্যভূমি : মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন পিটিআইতেও ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর আরো একটি ক্যাম্প। এই ক্যাম্পেও নির্যাতন করে হত্যা করা হতো বাঙালিদের। লাশ পুঁতে রাখা হতো পিটিআইয়ের উল্টো দিকে একটি নিচু জমিতে। সেখানে এখন গড়ে উঠেছে বিআরডিবির ভবন। সাটুরিয়া হাইস্কুলের বধ্যভূমি : সাটুরিয়া হাইস্কুলেও ছিল পাকবাহিনীর ক্যাম্প। নির্যাতনের পর স্কুলের পেছনে শুকনো খালে গর্ত করে পুঁতে রাখা হতো লাশ।
মানিকগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা ডেপুটি কমান্ডার মহম্মদ মমিন উদ্দিন জানান, এসব বধ্যভূমি একসময় চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু জমিগুলো দখল হয়ে গেছে। তিনি এ জন্য প্রশাসন, রাজনৈতিক ও মুক্তিযোদ্ধা নেতাদের দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান।
নান্দাইল (ময়মনসিংহ): কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ময়মনসিংহের নান্দাইলের কালিগঞ্জ রেলওয়ে বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ধরেই এখানে চলে নির্বিচারে গণহত্যা। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো অবহেলিত এ বধ্যভূমি, নির্মাণ করা হয়নি কোন স্মৃতিস্তম্ভ। ময়মনসিংহ ভৈরব রেল পথে নান্দাইল উপজেলার মুশুলী ইউনিয়নে নরসু্ন্দা নদীর ওপর কালিগঞ্জ রেলওয়ে ব্রিজটি অবস্থিত। পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে এই ব্রিজের ওপর নির্বিচারে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দিত। কালিগঞ্জ রেলওয়ে ব্রিজকে বধ্যভূমি স্বীকৃতি দিয়ে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের দাবি এলাকাবাসীর। নান্দাইল মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার গাজী আব্দুস সালাম ভুঁইয়া (বীর প্রতীক) বলেন, কালীগঞ্জ রেলওয়ে এই ব্রিজ এলাকাটি বধ্যভূমি চিহ্নিত করার পাশাপাশি এখানে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের।
সৈয়দপুর (নীলফামারী):নীলফামারীর সৈয়দপুরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজ আর্থিক সংকটে আটকা পড়ে আছে। ১৯৭১ সালে ১৩ জুন পাকিস্তানি বাহিনীর দোসররা হিন্দু এবং বাঙালিদের ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলে ট্রেনে দুই কিলোমিটার দূরে নির্জন এলাকায় গোলাহাট নামক স্থানে এক এক করে নারী, পুরুষ ও শিশুদের হত্যা করে।
বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর গত বছর ১৩ জুন গোলাহাট বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ শুরু হয়। স্মৃতিসৌধের পাশে মন্দির, পার্ক, পুকুর, রেস্ট হাউস নির্মাণেরও সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু অর্থ সংকটে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজ আটকা পড়ে গেছে।
স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কমিটির আহ্বায়ক রাজকুমার পোদ্দার জানান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে নেকদৃষ্টি দিলে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজসম্পন্ন করা যেতে পারে।
