টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনসের বেলাভূমিতে...

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৫, ১০:৪৮
নাফ নদীর পাশেই টেকনাফ। বার কয়েক এই অপরূপ টেকনাফ গিয়েও মনের ইচ্ছে অপূর্ণই রয়ে গেল। স্বপ্নের টেকনাফে আবারও এলাম। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে তখনি, সফরসঙ্গী প্রদীপ রায়। যদিও বয়সে সে ছোট তবু দু’জনার মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা বন্ধুর মতোই। প্রদীপ ভালো গান জানে, এজন্যই ওর সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক। এবার রাতটা কাটিয়ে পরদিন সেন্টমার্টিনস দ্বীপে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম দু’জনে। কম্বল মুড়ে শুয়ে আছি, চোখ জানালার দিকে। চোখের পাতায় ভেসে উঠল টেকনাফ নিয়ে নানা কথা। টেকনাফের প্রতি কেন দুর্বলতা, কেনই-বা দুর্বলতা জন্মেছিল সেইসব কথাও মনে পড়ল। ষোলো কী সতেরো বছর বয়সে ধীরাজ ভট্টাচার্যের লেখা ‘যখন পুলিশ ছিলাম’  বইটি পড়ে টেকনাফ নামটির সঙ্গে প্রথম পরিচিত হলাম। ১৯২৭-২৯ সালের দিকে তিনি ছিলেন টেকনাফের পুলিশ কর্মকর্তা। তার লিখনিতে টেকনাফের সৌন্দর্য নিয়ে ছিল কী অপূর্ব বর্ণনা। সেই যে মুগ্ধ হলাম তারপরে টেকনাফ ও মাথিনের কূপ দেখার জন্য ব্যাকুল হলাম। পরদিন সকাল সকাল প্রদীপ ও আমি চলে এলাম মাথিনের কূপের কাছে। আহা কী-ই না করুণ ইতিহাস! তত্কালীন মগ রাজার অপরূপ সুন্দরী কন্যা মাথিনের সঙ্গে রূপবানতুল্য যুবক ধীরাজ ভট্টাচার্যের প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কটি শেষতক রূপ নিল বিয়োগান্তক বা ট্রাজেডিময় পরিণতিতে। পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ কলকাতায় গিয়ে ফিরলেন না, চলচ্চিত্রে নায়ক হয়ে অভিনয় জগতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এদিকে তার প্রিয়তমা মাথিন অপেক্ষা করে করে অবশেষে বেছে নিলেন আত্মহত্যার পথ। মাথিনের কূপটি দেখে বার বার এসব কথাই মনে পড়ল। এবার প্রদীপ ও আমি মিয়ানমারের গা ঘেঁষা কক্সবাজার জেলার প্রান্তিক অংশ সাগর জলের মাঝে জেগে ওঠা ছোট্ট চিরসবুজ দ্বীপ সেন্টমার্টিনসের উদ্দেশ্যে রওনার প্রস্তুতি নিলাম। শুনেছি, অনেকেই সেন্টমার্টিনস দ্বীপটিকে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামে ডাকে। এবারও এক পথচারীর মুখে সে কথাই শুনলাম। ওই পথচারী আরো জানালেন, কক্সবাজার জেলার পশ্চিমে বেলাভূমি আর পূর্ব দিকে নাফ নদী। নাফ নদী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমারেখা। নাফ নদীর তীরে অবস্থিত টেকনাফ, সেন্টমার্টিনস যাওয়ার জন্য এখান থেকেই জাহাজ ছাড়ে। কথাটি শুনেই প্রদীপ ও আমি ছুটলাম নাফ নদীর তীরে। দেখি ওখানে কেয়ারি সিন্দাবাদ জাহাজ, একজন এগিয়ে এসে বললেন, যাবেন তো সেন্টমার্টিনসে, এখনই জাহাজ ছেড়ে যাবে! উঠে গেলাম জাহাজে। মিনিট দশেক পর ছেড়ে দিল জাহাজ। পাশে বসা ভদ্রলোকটি জানালেন, টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনস জলপথে দূরত্ব ৪২ কিলোমিটার। সময় লাগবে প্রায় ২ ঘণ্টা। কেয়ারি সিন্দাবাদ ছাড়াও এ জলপথে এলসিটি কুতুবদিয়া নামে কয়েকটি জাহাজ চলে।
সাগর হয়ে চলছে কেয়ারি সিন্দাবাদ, উত্তাল ঢেউয়ে বার বার দোল খাচ্ছে। ততক্ষণে ভয়ে অনেকটা অস্থির। তবুও সে আনন্দের... দূরের সেন্টমার্টিনসকে একটি সবুজ গোলার মতো মনে হলো বার বার। কাছে এসে দেখি অসংখ্য নারকেল গাছের ছড়াছড়ি। বাহ্্, সবুজ নারকেল গাছের ঘন সন্নিবেশের কারণেই এই দ্বীপকে অনেক মানুষ বলে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’। ওখানে নেমে মনে হলো, ভূমিক্ষয় এতটাই যে কোথাও কোথাও বেলাভূমি একেবারেই নেই। সমুদ্র সৈকতে পাথরের চাঁইয়ের মতো অসংখ্য মৃত প্রবালের স্তূপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। সমুদ্রের জল বেশ ঘোলাটে এখানে। দ্বীপবাসিনী ছোট্ট মেয়েটি ঝিনুক খুঁজতে খুঁজতে বলল, দ্বীপের চারপাশে সমুদ্রের জলের রঙ সারাক্ষণই বদলায়। দুপুরে যা ঘোলাটে, বিকেলে তার রঙ হয় নীল।
প্রদীপ ও আমি এক নারকেল গাছের তলে গিয়ে বসলাম। দু’জনে চার নয়ন ভরে দেখে যাচ্ছি বঙ্গোপসাগরের রূপ। এ রূপের কি আর তুলনা হয়। সন্ধ্যা নেমেছে, তবুও ফিরছি না হোটেলে। সেন্টমার্টিনসের সাগর বেলা ছেড়ে যেতে মন চাইছিল না তখনও। প্রদীপ গান ধরল ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে, সাত সাগর আর তের নদীর পাড়ে— ময়ূরপঙ্খী ভিড়িয়ে দিয়ে সেথা, দেখে এলাম তারে, সে এক রূপকথারই দেশ..।’ ভাবলাম, বাহ্্ এ তো রূপকথারই দেশ। হঠাত্ এক কিশোর বকুল ফুলের মালা হাতে তুলে দিয়ে— স্যার নিন, মালাটা গলায় পরে নিন। আপনাকে বড্ড মানাবে। বললাম, ‘তুমি পরিয়ে দাও।’ একটু হেসে কিশোর ছেলেটি খুব কাছে এসে গলায় পরিয়ে দিল। তোমার নামটি? সজীব। বাহ্্ সুন্দর নাম তো তোমার। দেখতেও যে তুমি সজীব। বন্ধু হবে আমার। হাসল সজীব। প্রদীপ বলল, চলো আমাদের সঙ্গে রাতে হোটেলে খেয়ে দেয়ে নাহয় বাড়িতে ফিরবে। তাকিয়ে দেখি, ছেলেটির মুখে এক ঝিলিক হাসি। এবার আমাদের পিছু পিছু চলল সজীব। তখন ওর কণ্ঠে শুনলাম, ‘মনে হয় যেন তারে আমি চিনি/কার মন্দিরে বাজে’ গানের কথাগুলো। সজীব, আপনারা তো টেকনাফ হয়ে এসেছেন? বললাম, হ্যাঁ। জানেন, টেকনাফের নাফ নদীর বাঁদিকে মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ। নাফ নদীর তীরে যদি যান দেখবেন, রাস্তা দিয়ে মিয়ানমারের পুরুষ-মহিলারা যাতায়াত করছে। দূর থেকে আরো দেখবেন, হাটে-বাজারে চলছে বেচাকেনা। নাফ নদীর ডান দিকে ন্যাটনম পাহাড়। ন্যাটনম কথাটি একটি মগ শব্দ, যার অর্থ হলো ‘দেব তাদের জন্য বন’। এই বন একটি সংরক্ষিত অভয়ারণ্য, সেখানে নেকড়ে, বনমুরগি, হরিণ, ভল্লুকদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এই ন্যাটনম পাহাড় যেখানে শেষ সেটাই বাংলাদেশের শেষ ভূখণ্ড। জানেন, নামটা হলো— ‘এলিফ্যান্টস পয়েন্ট’। বললাম, বাহ্্ তুমি তো অনেক খবরাখবর রাখ। সজীব এক সময় তো আমরা টেকনাফে ছিলাম। আমার বাবা আরাকান রাজ্যে বিয়ে করে আমাদের ছেড়ে এখন তো মিয়ানমারে রয়ে গেছে। এক সময় তো সেই ৭ কি ৮ বছর বয়সে প্রায়ই আরাকান রাজ্যে যেতাম। ‘এখন তোমার বয়স?’ পনেরো। তাকিয়ে রইলাম সজীবের পানে। ততক্ষণে আমরা চলে এলাম হোটেলে। সজীবকে বসতে দিয়ে বাথরুমের কাজ শেষ করে হোটেল বয়কে বললাম, তিনজনার খাওয়া নিয়ে এসো। ওই যে ছেলেটা দেখছ ও আমাদের মেহমান। হোটেল বয় একটু হেসে ‘ঠিক আছে স্যার যাচ্ছি।’
রাতে কেমন জানি একটু ভয় ভয় লাগল। নতুন জায়গা তাই হয়তো সেই রাতে এমনটিই হয়েছিল। ঘুম ভেঙে গেল সকাল ছয়টা বাজতেই। দরজা খুলে বাইরে দাঁড়াতেই দেখি, সজীব এগিয়ে আসছে...। ওর হাতে বকুল ফুলের মালা, কাছে এসে— নিন, মালাটা নিন। আজ তো চলেই যাচ্ছেন। আমাদের বাড়িতে বেড়ালেন না, খুব কষ্ট লাগছে। বললাম, আবার যখন আসব তখন নাহয় যাব। কথাটা শুনে সজীব খুশি হতে পারল না। সকাল আটটায় আমরা হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। জাহাজে উঠে বসলাম। ছেড়ে দিল জাহাজ...। তাকিয়ে দেখি ওই যে সজীব হাত নেড়েই যাচ্ছে। তখন শুধু পেছনে তাকিয়ে থাকা।
n লেখক : গবেষক