আনন্দ, বেদনা ও বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে আন্দোলনের নামে সহিংসতা-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড রুখে দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বাঙালি জাতি পালন করল ৪৫তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। শ্রদ্ধাবনত জাতি ফুলে ফুলে ভরে দেয় সাভারস্থ জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধুর মাজারের বেদিমূল। লাল-সবুজ পতাকা হাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে একই স্লোগান— সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।
সত্যিই এক নতুন রূপে ও চেতনায় ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস পালন করল দেশবাসী। অন্যরকম স্বস্তি, আনন্দ ও শপথে জেগে উঠেছিল বাঙালি। ‘রুখে দাঁড়াও পরাজিত শক্তির নাশকতা-হুংকার, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি এবার’ এমন স্লোগানে জাতীয় স্মৃতিসৌধে নতুন প্রজন্মের ছিল বাঁধভাঙা স্রোত।
গতকাল প্রত্যুষে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে সূচনা হয় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানমালার। ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে বীর শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল এ সময় গার্ড অব অনার প্রদান করে। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা। এ সময় মন্ত্রিবর্গ, উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, মুক্তিযোদ্ধারা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকগণ, উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে রাখা পরিদর্শক বইতে স্বাক্ষর করেন।
সকালে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত সমরাস্ত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এ সময় লাল-সবুজ ধোঁয়া উড়িয়ে বিমান বাহিনীর একটি ফ্লাই পাস্ট রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানায়। সকাল ৭টায় প্রধানমন্ত্রী ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় শিশু-কিশোর সমাবেশে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল ছিল সরকারি ছুটি। স্বাধীনতা দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে বেতার, টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয়। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ভবন, বাড়িঘর, যানবাহন ও দোকানে ওড়ে জাতীয় পতাকা। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়। সারাদেশের মসজিদে বিশেষ মোনাজাতে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত, দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করা হয়। মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাতেও বিশেষ প্রার্থনা সভার ব্যবস্থা করা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন-প্রতিষ্ঠান আনন্দ শোভাযাত্রা, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ নানা আয়োজনে মহান স্বাধীনতা দিবস পালন করে। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন ও মোনাজাত করা হয়। সশস্ত্র বাহিনীও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্র, হাসপাতাল, জেলখানা, সরকারি শিশুসদনসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানসমূহে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়।
স্মৃতিসৌধে যাননি খালেদা জিয়া: বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাননি। গতকাল স্মৃতিসৌধে শহীদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেন, খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ তাই তিনি শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি। এসময় স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এনামুল ইসলাম, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নানসহ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় পার্টির (জেপি) শ্রদ্ধাঞ্জলি: দিবসটি উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৬টায় দলের কেন্দ্রীয় ও দেশের সকল দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে দলের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এ সময় জেপি নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, ভাইস চেয়ারম্যান শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন, যুগ্ম মহাসচিব খলিলুর রহমান খলিল, খন্দকার শাহীন আলদ্বীন রিজভি, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, দপ্তর সম্পাদক এম. সালাহ উদ্দিন আহমেদ, প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম তপন, প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক কে এম মজিবুর রহমান মজনু, শিক্ষা ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট এনামুল ইসলাম রাসেল, যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক জীবন কৃষ্ণ বৈরাগী, নরসিংদী জেলার সভাপতি সাদেকুর রহমান, যুব সংহতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মঞ্জুর হাবিব, মানিকগঞ্জ জেলা জেপি নেতা দুলাল পাল প্রমুখ।
বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের শ্রদ্ধা: সকালে উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গণফোরাম, এলডিপি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সেক্টর্স কমান্ডারস ফোরাম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাসদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বাসদ, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশ বেসরকারি মেডিক্যাল প্রেকটিশনারর্স এসোসিয়েশন, মহিলা পরিষদ, কৃষক লীগ, কৃষক সমিতি, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, যুবলীগ, যুব ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, জাসাস, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, বঙ্গবন্ধু সংসদসহ বিভিন্ন দল, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। এছাড়া স্মৃতিসৌধের বেদিতে ফুল দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জনতা ব্যাংক, এডাব, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় শ্রমিক লীগ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা: সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও ইউসূফ হোসেন হুমায়ুন, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাহারা খাতুন ও সতীশ চন্দ্র রায়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আইন বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মতিন খসরু, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ প্রমুখ।
এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা ত্যাগ করার পর সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক।
স্বাধীনতা স্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদুঘর উন্মুক্ত : মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’ ও ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। স্বাধীনতা জাদুঘরটি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার বাস্তব নিদর্শনে আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৪৪টি প্যানেলে বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতিসত্তার স্বাধীনতার ইতিহাস আলোকচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। আলোকচিত্রের মধ্যে রয়েছে মুঘল আমল থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সময়ের ছবি, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ছবি। আছে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের এবং ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিশাল আকৃতির দুটি ছবি। এছাড়া যে টেবিলের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার লে. জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন তার অনুকৃতি (রেপ্লিকা)। রয়েছে বিভিন্ন বিদেশি পত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কপি এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষে বহির্বিশ্বে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পুস্তিকার ছবি।
বঙ্গবন্ধুর চেতনা সদা জাগ্রত রাখতে হবে : ভিসি ডা. কামরুল
সকাল সাড়ে ৮টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খানের নেতৃত্বে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, ডীনবৃন্দ, বিভাগীয় চেয়ারম্যানবৃন্দ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, চিকিত্সক, কর্মকর্তা, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ও কর্মচারীবৃন্দ সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে কামরুল হাসান খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সদা জাগ্রত রেখে জামায়াত-বিএনপি’র অপরাজনীতিকে মোকাবিলা করতে হবে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে-এটাই হোক স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার।
