বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুহার কমিয়াছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। স্বাস্থ্যখাতে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস করিবার যে অসামান্য সাফল্য বাংলাদেশ অর্জন করিয়াছে এবং তাহা অব্যাহত রাখিয়াছে—ইহার বারংবার প্রশংসা করিয়াছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল, ইউনিসেফ। তবে সাফল্য অর্জনের পথে নূতন সমস্যার পাশাপাশি পুরাতন, কিন্তু গোচরীভূত নহে, এমন সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ হইয়া দেখা দেয়। সমপ্রতি ব্রিটেন, ভারত ও বাংলাদেশের সমন্বিত একটি গবেষণা দল জানাইয়াছেন—স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবস্থলেই ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়িতেছে নবজাতক ও প্রসূতি। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, বাড়িতে সন্তান প্রসবের পরিবেশ হইতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণের ঝুঁকি অধিক দেখা গিয়াছে।
নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়াই নিরাপদে সুস্থ সন্তান প্রসবের জন্য নারীদের উত্সাহ দেওয়া হয়। তাহার ফলাফলও আমরা দেখিয়াছি। ম্যাজিকের মতো প্রসূতি ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পাইয়াছে। সুতরাং স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো স্বাস্থ্যসম্মত হইবার বিকল্প নাই। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিশ্চয়ই নিয়মমাফিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণরোধী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সেই ব্যবস্থায় গলদ কিংবা তাহা কার্যকরে অবহেলা থাকিলে প্রসবকালে সংক্রমণ ঘটিবার ঘটনা বৃদ্ধি পাইবে বৈকি। বিভিন্ন গবেষণায় সমপ্রতি ইহা স্পষ্ট হইয়াছে যে, সাধারণ পরিচ্ছন্নতা প্রসূতির সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করিতে এখন আর যথেষ্ট নহে। কেননা, অনেক নামিদামি হাসপাতালের প্রসূতিবিভাগেও সংক্রমণের বিপজ্জনক ঝুঁকির চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে উল্লিখিত গবেষণায়। তাহার অর্থ, দৃশ্যত হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হইলেও সেই পরিচ্ছন্নতা জীবাণু সংক্রমণরোধে যথেষ্ট নহে। কর্তৃপক্ষের অগোচরেই জীবাণুর দল বাসা বাঁধিতে পারিতেছে নির্বিঘ্নে। তাহা ছাড়া গত কয়েক দশকে ঔষধ কিংবা প্রতিষেধক-প্রতিরোধী জীবাণুর সংখ্যাও বাড়িয়াছে এবং ক্রমাগত বাড়িতেছে। অথচ সিংহভাগ হাসপাতালকে জীবাণুমুক্ত করা হয় দশকের পর দশক চলিয়া আসা পুরাতন-পন্থায়। বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফ প্রদত্ত তথ্য হইতে জানা যায়, বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটিয়া থাকে শিশুর জন্মের প্রথম ২৮ দিনের মধ্যেই। প্রসূতিমৃত্যুর বড় কারণও প্রসূতিকালীন সংক্রমণ। স্বাভাবিকভাবেই প্রসূতিকালীন এই সংক্রমণ রোধ করিতেই বাস্তবোচিত পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে।
এই দেশে ৭১ শতাংশ গর্ভবতী নারী এখনও গৃহেই সন্তান প্রসব করিয়া থাকেন। অথচ সেই গৃহের তুলনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যদি সংক্রমণের জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে, তবে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু প্রতিরোধের সাফল্যের চিত্র মলিন হইতে থাকিবে। কারণ, প্রসূতিকালীন সময়ে মা ও শিশুর জন্য সংক্রমণ-ঝুঁকিমুক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রই সর্বাধিক নিরাপদ জায়গা। সুতরাং গৃহে সন্তান প্রসব নিরুত্সাহিত করিবার পাশাপাশি প্রসূতিকালীন সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র সংক্রমণমুক্ত করিবার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক। ইহার জন্য প্রয়োজনে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা করা হউক।
